// Rashifal
Rashifal / By Sumit Mukherjee
মেষ রাশি
আর্থিক পরিস্থিতি যথেষ্ট সন্তোষজনক থাকবে। তবে খরচ অনেকটাই বাড়বে। কোন কাজ নানা কারণে সম্পূর্ণ হতে বিলম্ব হলে সেই কাজের পিছনে সময় ব্যয় করবেন না। হয়তো সেটা সময় নষ্টই হবে। আত্মীয়দের থেকে বিরূপ ব্যবহার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বড় বিনিয়োগে ঝুঁকি নেবেন না। সন্তানের সাফল্যে মানসিক শান্তি আসবে। আত্মবিশ্বাস খুব ভালো, তবে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আপনাকে এ মাসে অনেক সমস্যায় ফেলবে। মায়ের স্বাস্থ্য চিন্তায় রাখবে। দাম্পত্য সম্পর্কে যত্নের প্রয়োজন। ফ্ল্যাট সংক্রান্ত বিষয় সুখবর পাবেন। দুর্ঘটনার যোগ রয়েছে।
বৃষ রাশি
মাঝেমধ্যেই মেজাজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। কাজের জন্য প্রচুর ঘোরাঘুরি বাড়বে কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। তবে বাড়ির পরিবেশ অনেকটাই অনুকূলে থাকবে। খরচে নিয়ন্ত্রণ রাখুন। মানসিক চাপ কিছুটা বাড়বে। কাজের জায়গায় হঠাৎ পরিবর্তন হতে পারে। অর্থ বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন। নতুন কোন কোর্সে ভর্তি হবার সুযোগ আসবে। আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে।
মিথুন রাশি
উপার্জন খুব সন্তোষজনক হবে। পরিবারে নিজের আধিপত্য বজায় থাকবে। প্রেসারের চেকআপ এবং হাটের চেকআপটা অবশ্যই নিয়মিত করবেন। কাছের বন্ধুদের থেকে সাহায্য পাবেন নানাভাবে। মানসিক চাপ বাড়বে। খুব চিন্তা ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। পেশাগত ক্ষেত্রে বৈদেশিক যোগাযোগের জন্য পজেটিভ ফল আসবে। আত্ম অহংকারের জন্য সম্পর্কে ক্ষতি হবে। বসের সঙ্গে সম্পর্কে যত্নশীল হবেন। ভ্রমণের যোগ রয়েছে। খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। খুব প্রয়োজন না হলে লোন নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। বিনিয়োগ থেকে পারলে নিজেকে এ মাসে একটু দূরেই রাখুন।
কর্কট রাশি
চোখের পাওয়ারটা চেক করার প্রয়োজন হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে নিজের প্রবল প্রাধান্য বৃদ্ধি পাবে। স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে। উপার্জন বৃদ্ধি পাবে। দুর্ঘটনা, চোট আঘাত সমস্যা তৈরি করবে। গুপ্ত শত্রু থেকে সাবধান। নতুন কোন কোর্স শিখতে শুরু করতে পারেন। ভাগ্যের সহায়তা এ মাসে সবসময় পাবেন না। নিজের আত্মবিশ্বাস ও পরিশ্রমের মাধ্যমে উন্নতি ও এগিয়ে যেতে হবে। রাগকে প্রবল নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করুন, না হলে অনেক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। বড় কোন বিনিয়োগের থেকে এমাসে বিরতই থাকুন।
সিংহ রাশি
কর্মক্ষেত্রে প্রভাব ও দক্ষতার হাত ধরে সাফল্য আসবে। কাজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ও প্রাধান্য বজায় থাকবে। লেখাপড়া ও পেশার জন্য দূর গমনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। বড় ধরনের বিনিয়োগ করে ফেলবেন না। ঋণ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন। আয় উন্নতি বেশ ভালই থাকবে। বাইরে গেলে, গাড়িতে যাতায়াতের সময় অতিরিক্ত সতর্কতার প্রয়োজন - বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব বাড়বে। স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন বাড়াতেই হবে।
কন্যা রাশি
পেশাগত জীবনে তুমুল সফলতার স্বাদ পাবেন। জীবনে আনন্দ ও বিনোদন যথেষ্টই থাকবে। ভাগ্যের উত্থানের গতি কিছুটা শ্লোথ থাকবে। বাড়ি/ ফ্ল্যাট কেনার যোগ চলছে, বাস্তবায়নের চেষ্টা করুন। লোন শোধের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। রোমান্টিক মানসিকতা বৃদ্ধি পাবে। শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা রক্ষণশীল হবেন। নতুন দায়িত্ব পেতে পারেন পেশাগত ক্ষেত্রে। শরীরের যত্ন বাড়ান। রাস্তায় চলাফেরা করার সময় বাড়তি সর্তকতা নিতেই হবে।
তুলা রাশি
কাজের জায়গায় যথেষ্ট উন্নতির যোগ দেখা যাচ্ছে। মাসের প্রথম দিকটা একটু সাবধানে থাকবেন। গাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার যোগ রয়েছে। কারো সঙ্গে কোন প্রকার অফিসিয়াল যোগাযোগ করার প্রয়োজন হলে খুব সাবধানতা অবলম্বন করে তা করবেন। উপার্জন মনের মত হবে। শত্রুরা বিশেষ ক্ষতি করতে পারবে না। একটু সাবধানে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করবেন। অর্শের প্রাদুর্ভাব বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পেশাগত স্থানে নিজের যোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। গবেষকদের জন্য ভালো সময়। শেয়ার বা অন্য কোন প্রকার আর্থিক লেনদেন একটু সাবধানে করবেন। কোমর ও পায়ের ব্যথা বৃদ্ধি পাবে।
বৃশ্চিক রাশি
চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন, না হলে খুব বড় ধরনের সমস্যায় পড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ সম্পত্তি লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। খুব সাবধানে ড্রাইভ করবেন, রাস্তায় চলাফেরা করবেন। গার্হস্থ্য সুখে কিছু সমস্যা রয়েছে। বাড়িতে ছোটখাটো অশান্তি লেগেই থাকবে। বাবার শরীর ভোগাবে ।আপনাদের নাম যশ বেশ অনেকটাই বাড়বে। হজমের সমস্যা ভোগাবে কিন্তু জীবনীশক্তি খুব ভালোই থাকবে। পেশাগত জীবনে নতুন কোন দিশা বা পথের শুভ সূচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
ধনু রাশি
কোন বাধা যা ভয়ংকর ভাবে সমস্যা তৈরি করছিল এতদিন তার থেকে মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। নতুন কোন বিনোদনের জিনিস লাভ হবে।আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকর্ষণ বাড়বে। মায়ের শরীর আগের থেকে উন্নতির পথে এগোবে। যারা বিবাহের কথা ভাবছেন তাদের জন্য সময় অনুকূল।পরিবারে মোটামুটি শান্তি বজায় থাকবে। আপনাদের মিষ্টি ব্যবহার এ মাসে পেশাগত জীবনে উন্নতির সহায়ক হবে। পা ও কোমরের ব্যথা বাড়বে। ঘরে বাইরে সকল সম্পর্কে যত্ন বাড়াতে হবে। খরচে লাগাম টানুন।
মকর রাশি
জীবনে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বাড়বে। হজম সংক্রান্ত সমস্যা ঝামেলায় ফেলবে। ফ্ল্যাট কেনার ভাবনা চিন্তা থাকলে বিষয়টি বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করতে পারেন। কথার জন্য সমস্যা তৈরি হবে। ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করুন। নতুন উদ্যোগে কর্মক্ষেত্রে অনেকটা উন্নতি ঘটবে। বাইরে যাবার সুযোগ আসবে। গুপ্ত শত্রুর বিষয়ে চোখ কান খোলা রাখুন। কাছের মানুষের সাহায্য পাবেন। ভাগ্যের সহায়তা আপনার অনুকূলে থাকবে। মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন বাড়ান।বড় বিনিয়োগ থেকে এ মাসে একটু দূরেই থাকুন। কথা বলার ক্ষেত্রে খুব সাবধান। আত্ম অহংকার নিয়ন্ত্রণ রাখুন।
কুম্ভ রাশি
স্বাস্থ্য ভোগাবে। পুরানো রোগ আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। জমি, বাড়ি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে খুব ধৈর্য ধরে বারংবার চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। কথাবার্তায় নম্রতা বাড়ান নতুবা আপনজন আপনার কথায় আঘাত পাবে। কঠিন পরিস্থিতি আপনার দৃঢ় ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য অনুকূলে আসবে। সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানসিক অস্থিরতাও বৃদ্ধি পাবে। প্রভাবশালী বন্ধু ও আত্মীয়র যোগাযোগ কাজে লাগবে। স্বাস্থ্যের যত্ন বাড়ান। ব্যবসায়ীদের জন্য সময়টি অনুকূল।
মীন রাশি
মানসিক অবসাদ, বিষন্নতা তীব্র হবে। নতুন উদ্যোগ শুরু করতে পারেন। পারিবারিক সহযোগিতা আপনার সাথে থাকবে। নিজের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে। বাড়ির মানুষের অনেক সহায়তা পাবেন। সন্তানের উন্নতির জন্য মানসিক তৃপ্তি বৃদ্ধি পাবে। কর্মক্ষেত্রে উন্নতি কিছুটা মন্থর হবে। উদ্বেগ, চিন্তা বাড়বে। রাগের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখুন। বিদেশ যাত্রার যোগ রয়েছে।
18/07/2026, রাত 08 থেকে 9-15 সারেঙ্গাবাদ স্কুল
মঞ্চে উপবিষ্ট সবাইকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আজকের যে বিষয় অর্থাৎ হিন্দু সংস্কৃতির বিশেষত্ব ও হিন্দু জীবন শৈলী এই নিয়ে কিছু বলার প্রয়াস রইল।
হিন্দু সংস্কৃতি এবং হিন্দু জীবনশৈলী এই দুটো বিষয়ে পারস্পারিক সম্পর্কযুক্ত অথচ স্বাধীন। বিষয়ের গভীরে যাওয়ার জন্য আমি কতগুলো স্তরে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব। প্রথমে সংস্কৃতি এবং জীবনশৈলী কি সেটা বোঝার প্রয়াস থাকবে। তারপর সংস্কৃতি এবং জীবন শৈলীর আমাদের জীবনে গুরুত্ব কি সেটা বোঝার চেষ্টা করব। তারপরে হিন্দু সংস্কৃতি এবং হিন্দু জীবন শৈলীর বিশেষত্ব কি এ ব্যাপারে আলোচনা করব তার সাথে সাথে আমাদের এই সনাতন সংস্কৃতি এবং জীবনশৈলী যে কয়েক হাজার বছর ধরে চলে আসছে এবং আজও পুরো মাত্রায় সজীব এবং এর যে কোন মৃত্যু নেই বা ধ্বংস নেই তার কারণ খোঁজার চেষ্টা থাকবে। এর সাথে সাথে আমাদের শ্রদ্ধেয় মহাপুরুষ যারা আছেন বা ছিলেন তারা কিরকম ভাবে নিজেদের জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন যে সংস্কৃতি এবং জীবনশৈলী অনুশীলন আমাদের সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয় এবং জাতি হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা যায় তার কিছু উদাহরণ দেবো। এর সাথে সাথে বর্তমান আধুনিক যুগে এই প্রাচীন সংস্কার গুলো কিভাবে যুগোপযোগী করে প্রয়োগ করতে পারি সেটাও খোঁজার একটা চেষ্টা করেছি। এবং সবশেষে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ কিভাবে নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতি এবং সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে সম্বন্ধে কিছু বলবার ইচ্ছে রইল। যাইহোক শুরু করা যাক, প্রথমে আসি সংস্কৃতি এবং জীবনশৈলী বলতে আমরা কি বুঝি। সংক্ষেপে ডেফিনেশন বা সংজ্ঞা,কারণ কোন জিনিসের সংজ্ঞা যদি পরিষ্কার থাকে তাহলে দ্রুত সেই জিনিসের গভীরে ঢোকা যায়। সংস্কৃতি বলতে আমরা সাধারণত জাতি সমাজ গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের অর্জিত জ্ঞান বিশ্বাস মূল্যবোধ রীতিনীতি শিল্প সাহিত্য ভাষা এবং আচার-আচরণের ব্যবহারিক প্রয়োগ বলতে পারি। সহজ ভাবে বলতে গেলে আমাদের বিশ্বাস উদযাপন ভাবনা যেমন আমরা বাঙালিরা বৈশাখ মাসের ১ তারিখ অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ নববর্ষ উদযাপন করি পয়লা বৈশাখ বলতেই মনের মধ্যে নতুন পোশাক ভালো ভালো খাবার মেলা ইত্যাদির ছবি ফুটে ওঠে। দুর্গা পূজার সম্বন্ধে নতুন করে কিছু বলার নেই শ্রাবণের শেষ থেকেই মনের মধ্যে ঢাক বাজতে থাকে যে মা এবার আসবে পৃথিবীর যেকোন প্রান্তেই বাঙালি থাকুক না কেন তার মনের মধ্যে কাশফুলের আলোড়ন এবং মায়ের সেই আগমনের প্রতীক্ষা জেগে ওঠে। খাদ্যের কথা বলতে পারি, ভারতের যেখানেই যাই না কেন দেখবেন মাছ ভাতের একটা দোকান আছে বেড়ানোর জায়গাতে এবং অনেক জায়গায় লেখা থাকে বাঙালি মাছ ভাত পাওয়া যায়। সুতরাং খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে ও একটা জাতিসংস্কৃতি বোঝা যায়। এছাড়া আমাদের রবীন্দ্রনাথ আছেন সত্যজিৎ আছেন ঋত্বিক ঘটক আছেন এরকম আরো বহু জ্ঞানীগুণী মানুষ আছেন যাদের নাম মানসপটে উদয় হলেই আমাদের সংস্কৃতির একটা ধারা বোঝা যায়। আর আধ্যাত্মিকতার বিষয়টা যদি ভাবা হয় তাহলে স্বামীজি ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আচার্য প্রণবানন্দ শ্রী ঠাকুর চৈতন্য মহাপ্রভু এরকম আরো বহু মহাত্মার কথা মানস পটে আসে। এইসব মিলিয়ে একটা জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। যেহেতু এখানে আমরা সম্ভবত সবাই বাঙালি, তাই আমি আমাদের এই বঙ্গভূমি থেকে উদাহরণগুলো বেছেছি কিন্তু ভারতবর্ষের দিকে যদি তাকানো যায় দেখব সেখানে এরকম প্রচুর উদাহরণ আছে যার মাধ্যমে আমাদের ভারতের হিন্দু সংস্কৃতি ফুটে ওঠে। যেমন দেওয়ালি যেমন পুরীর রথযাত্রা যেমন দক্ষিণ ভারতের তিরুপতি মন্দিরে মস্তক মূন্ডন, অযোধ্যায় মর্যাদা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রী রামের মন্দির, পাঞ্জাবীদের ভাঙরা নাচ ভারতনাট্যম কথকলি ওডিসি বিভিন্ন শাস্ত্রীয় সংগীত শিক্ষায় এপিজে আবদুল কালাম হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা ইত্যাদি আরো বহু রকম। তাহলে বুঝতে পারছি যে একটি জাতির সংস্কৃতির উপাদান প্রধানত সেই জাতির ভাষা ধর্ম উৎসব খাদ্যাভ্যাস পোশাক রীতিনীতি ইত্যাদি। এগুলো কিন্তু একদিনে বা অল্প দিনে গড়ে ওঠে না। এর পেছনে দর্শন এবং বহু মুনি ঋষির সু নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষিত বা আবিষ্কৃত বলতে পারি, চিন্তা ভাবনা দায়ী। এবার আসি জীবনশৈলী কাকে বলে সেই নিয়ে কিছু বলার জন্য। এক কথায় বলা যায় যে একজন মানুষের প্রতিদিনের যে যাপন তাকে আমরা সংক্ষেপে জীবনশৈলী বলতে পারি। মানে সে সারাদিন কি করে কখন ঘুম থেকে উঠে কি খায় কি ধরনের কাজ করে অবসর সময় কিভাবে কাটায় ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। জীবনশৈলী কিন্তু প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা হতে পারে শুধু তাই নয় বাসস্থান ভেদে জীবনশৈলী সম্পূর্ণ পরিবর্তনও হতে পারে। এমনকি মানুষ যদি শুধুমাত্র বাসস্থানের পরিবর্তন করে ফেলে কিছুদিনের জন্য হলেও তার জীবনশৈলী পাল্টে যেতে পারে।
জীবন শৈলী নির্ভর করে উপার্জন শিক্ষা পেশা রুচি এবং সময়ের উপর। যদি কেউ উচ্চ উপার্জনশীল হন তাহলে তার গাড়ি চড়া অভ্যাস থাকবে আবার নিম্নবিত্ত লোকেরা বাসে ট্রেনে যাতায়াত করেন সে রকম উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি সমাজের উচ্চপদস্থ জায়গাতে সাধারণত চাকরি রত হন। আবার যারা কিছুটা স্বল্প মেধার জনগণ আছেন তাঁরা সাধারণত পরিশ্রমসাধ্য পেশায় নিয়োজিত থাকেন। তার মাধ্যমে জীবন ধারণ করেন। বোঝাই যাচ্ছে দুটি স্তরের মধ্যে জীবন শৈলীর অনেকটা তফাৎ হয়ে যায় কিন্তু জীবন শৈলীতে তফাৎ থাকলেও উভয়ের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন কিন্তু অটুট থাকে। দুর্গাপূজায় বা পয়লা বৈশাখে বা রবীন্দ্রজয়ন্তীতে একই রকম উৎসাহ নিয়ে তাঁরা অংশগ্রহণ করেন। জীবনশৈলী নির্ভর করে আমরা কিভাবে বাঁচি কি খাই কি পরি ছুটি কিভাবে কাটাই ইত্যাদি নানা রকম বিষয়। ধরুন যাঁরা গ্রামে বসবাস করেন তাঁদের সাধারণত ভোরের বেলায় ওঠা অভ্যাস। তাঁরা সাধারণত কৃষিকাজ বা কৃষিকাজ সংক্রান্ত কোন বিষয়ে পেশা গত জীবনে নিযুক্ত থাকেন। সাধারণত বাড়িতেই তাঁরা খাওয়া দাওয়া করেন অথবা বাড়ি থেকে খাবার সেটা পান্তা ভাত বা ওই জাতীয় কিছু সাথে করে নিয়ে যান কাজের জায়গায় বা কৃষি ক্ষেত্রে দুপুরে খাবার জন্য সন্ধ্যায় পাড়ায় একটু আড্ডা অথবা কোন স্থানে নাম সংকীর্তন ইত্যাদিতে সময় কাটান। আবার উল্টোদিকে শহরের মানুষের জীবনযাত্রা অনেকটা আলাদা। নির্দিষ্ট সময় অফিস যাওয়া বাইরে লাঞ্চ বা ব্রেকফাস্ট সন্ধ্যায় ক্লাব বা থিয়েটার বা কোন সিনেমা হলে যাওয়া, সপ্তাহ শেষে যা এখন উইকেন্ড বলে পরিচিত কোন জায়গাতে বেড়াতে যাওয়া অথবা নিজেদের মতন করে সময় কাটানো অনেক রাতে শোয়া ইত্যাদি। শহর গ্রাম ভেদে জীবন শৈলীর অনেক পরিবর্তন হয়ে যায়। কিন্তু সংস্কৃতির চরিত্র পাল্টায় না। খুব সামান্য উদযাপনের পদ্ধতিতে তফাৎ থাকে অবশ্যই কিন্তু সাধারণ চরিত্রটা একই থাকে। এক কথায় যদি ধরার চেষ্টা করি জীবনশৈলীকে বলা যেতে পারে যে ব্যক্তি অনুসারে তা নানারকম হতে পারে এবং ইচ্ছে করলে দ্রুত তাকে বদলে নেওয়া যায়। কিন্তু সংস্কৃতি সমাজের সবাইকে নিয়ে গড়ে ওঠে, এটা রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়।
আশা করছি আমরা সংস্কৃতি এবং জীবনশৈলী বিষয়টা কি সেটা মোটামুটি বুঝে গেছি। এবার একটু সংস্কৃতি এবং জীবনশৈলীর গুরুত্ব কি সেটা নিয়ে আলোচনা করব।
কোন একটি জাতির সংস্কৃতি বলতে সেই জাতির মন ইতিহাস এবং আত্মা বোঝা যায়, সংস্কৃতি জাতির পরিচয় তৈরি করে। যদি আমরা কোন ইংরেজ জাতির কথা ভাবি তাহলে সময়ানুবর্তিতা কথাটা চলে আসবে, আবার উল্টোদিকে আমাদের বাঙালি জাতির কথায় যদি আসি তখন দেখা যাবে আমরা প্রায়ই বলি বাঙালির টাইম একটু লেট হবে। এই উদাহরণটা দয়া করে মাথায় রাখবেন আমি ইচ্ছে করে এই উদাহরণটা নিলাম। কারণ একদম শেষে গিয়ে যখন সংঘের কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করবো তখন এই বিষয়টির উল্লেখ করব। যাইহোক যদি ধুতি-পাঞ্জাবি বলি, চোখ বন্ধ করে বাঙালি বুঝে যাব বা ভারতীয় বুঝে যাবো। যদি মাথায় পাগড়ী বলি সাথে সাথে পাঞ্জাবি বা শিখ সম্প্রদায় বুঝে যাব। যদি ধোসা ইডলি সাম্বার ইত্যাদির কথা বলি তাহলে দক্ষিণ ভারত বুঝে যাব। তার মানে বোঝা যাচ্ছে একটি সংস্কৃতির গুরুত্ব এতটাই যে কোন ব্যক্তি তার সামান্য প্রয়োগ করলে নির্দ্বিধায় সে কোন এলাকার বা কোন সম্প্রদায়ের লোক তা বলে দেওয়া যায়।
শুধু পোশাক বা খাদ্যাভ্যাস কেন, বিভিন্ন রকম উৎসব আছে -- যদি বিহু বলি আসাম বুঝে যাব যদি গনেশ পুজো বলি মহারাষ্ট্র বুঝবো যদি মুরুগ্যম বলি দক্ষিণ ভারত বুঝবো ইত্যাদি। কিছুটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে সমস্ত বাঙালিরা ভারতের বাইরে থাকেন তারা কোন বিদেশি শহরে যাবার পরে প্রথম যে জিনিসটা খুঁজতে থাকেন এখানে দুর্গাপুজো কোথায় হয়? বাঙালি তো, মন সব সময় ছটফট করে, দুর্গাপুজোর সময় দেশে আসতে না পারলে অন্তত বিদেশে কোন একটা দুর্গা পুজোতে অষ্টমীর অঞ্জলিটা দেওয়ার জন্য। বোঝাই যাচ্ছে এটাই সংস্কৃতির গুরুত্ব। সমাজকে বেঁধে রাখা, একটা জাতীয় চরিত্র তৈরি করা মূল্যবোধ ও নৈতিকতা আনা। সবচেয়ে বড় কথা একটি সংস্কৃতি মানসিক শান্তি নিয়ে আসে যেটা আর অন্য কিছুতে হয় না। একটু অর্থনীতির কথায় আসি। কোন জাতির সংস্কৃতি সেই অঞ্চলের বা সেই জনগণের অর্থনৈতিক উন্নতিরও সহায় হয়। হাতের কাছে দুর্গাপূজো আছে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে দুর্গাপূজা উপলক্ষে কি পরিমান অর্থনৈতিক লেনদেন আমাদের সমাজে হয়। শাড়ির কথা বলতে পারি, পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন রকম শাড়ি পাওয়া যায় যা কিন্তু সেই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ তৈরি করে। সুতরাং সংস্কৃতির গুরুত্ব শুধুমাত্র মূল্যবোধ বা নৈতিকতা নয়, তা ঐতিহ্য অর্থনৈতিক শিল্প ভাষা নিজস্ব পরিচয় সৃজনশীলতা সবকিছুর মধ্যেই তার স্বাক্ষর রাখে।
সংস্কৃতি যেরকম জাতির চরিত্র গঠন করে জীবনশৈলীর গুরুত্ব একজন ব্যক্তি মানুষের জীবন তৈরি করাতে।একটি ব্যক্তি মানুষের স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে সঠিক সুষ্ঠু জীবনশৈলী তার এবং সামাজিক উন্নতির সহায়ক হয়। যদি আমরা একটু কম প্লাস্টিক ব্যবহার করি যদি আমরা মোটরগাড়ি কম চড়ি যদি সাইকেল চড়ি যদি আমরা বিমানে পরিবহণ কমিয়ে কিছুটা ট্রেনে যাতায়াত করি যদি আমরা ব্যক্তিগত গাড়ি ছেড়ে দিয়ে বাসে যাতায়াত করতে পারি তাহলে দেখা যাবে যে দূষণ অনেক কমছে সমাজের অনেক উপকার হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে নিজেরও সর্বাঙ্গীণ উন্নতি হচ্ছে। এই যে আমরা এখন রাত জাগা অভ্যাস করে ফেলেছি এবং ফাস্টফুডে আমাদের আসক্তি বেড়ে গেছে। এটা কিন্তু আমাদের জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ঠিক এই জায়গাতেই জীবনশৈলীর গুরুত্ব। সঠিক জীবনশৈলী সঠিক মানুষ এবং সঠিক মানুষ মানে সঠিক সমাজ এবং সুস্থ ঐতিহ্যমান সংস্কৃতি।
এবার একটু আলোচনা করা যাক সংস্কৃতির বিভিন্ন অংশ নিয়ে। সময় পরিসর খুব অল্প তাই একটু পয়েন্ট ভিত্তিক আলোচনা করার চেষ্টা করছি, বিস্তৃত বিবরণ দেওয়ার এখানে সুযোগ নেই, সময়ান্তরে বলা যেতে পারে।
হিন্দু সংস্কৃতি বলতে আমরা সহিষ্ণুতা বুঝি, বহু প্রাচীন কাল থেকে আমাদের সনাতন ভারতের হিন্দু সংস্কৃতি পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই, প্রাচীন পারসিক জাতি যাদেরকে আমরা বর্তমানে ইরানি বলি তারা অগ্নি উপাসক ছিল। এবং মুসলিম আক্রমণের ফলে কিছু সংখ্যক লোক ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। গোটা দেশের ওই কিছু সংখ্যক লোক বেঁচে গেছিল তাদের সংস্কৃতি রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছিল শুধুমাত্র ভারতে আশ্রয় পেয়েছিল বলে। আমরা জানি বর্তমানে ইরান একটি ইসলাম রাষ্ট্র। আর সেই ছোট্ট জনগোষ্ঠী আজ ভারতবর্ষের উন্নতির কত বড় সহায়ক এবং আমাদের খুব কাছের বন্ধু। পারসিদের একটু পরিচয় দিলে বিষয়টা পরিষ্কার বোঝা যাবে ।।টাটারা পারসি গোষ্ঠীর লোক। আর স্মৃতি ইরানি যিনি আমাদের মন্ত্রী ছিলেন তিনিও ওই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি। বোঝা যাচ্ছে যে সনাতন হিন্দু সংস্কৃতি সবাইকেই তার সমান আদর এবং প্রাপ্য সম্মান দেয় যদি সে দেশবিরোধী না হয়।আমাদের হিন্দু সংস্কৃতি যে জীবন আমাদের সামনে উপস্থিত করে তা চতুবর্গ ফল পাওয়ার উপযোগী। চতুবর্গ বলতে ধর্ম অর্থ কাম এবং মোক্ষ বোঝায়। আমাদের সংস্কৃতির এটাই বিশেষত্ব যে মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলো আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার মাধ্যমে গড়ে তুলেছি। মানুষ মাত্রই উৎসব মুখর। আমাদের হিন্দু ভারতে সারা বছরই বিভিন্ন পূজা পার্বণ উপলক্ষে নানা রকম মেলা উৎসব হয়ে থাকে। আমরা জানি যে ১২ বছর অন্তর যে কুম্ভ মেলা হয় তা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বিজ্ঞাপনরহিত জনসমাগম। আমরা কেউ এটা ভেবে দেখি না কারণ এটা আমাদের রক্তের সাথে মিশে আছে। যদি চিন্তা করতাম তাহলে বোঝা যেত যে প্রচুর বিজ্ঞাপন করে ৫০ হাজার লোক যেখানে জড়ো করা যায় না সেখানে ৩০ কোটি ৪০ কোটি লোক স্বইচ্ছায় চলে আসে শুধু সংস্কৃতিতে ভর করে। এই সংস্কৃতির দৃঢ় শিকড়ের জন্যই প্রতিমুহূর্তে প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং শত্রু দেশের সন্ত্রাসবাদীদের হাতে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে অমরনাথ যাত্রায় ১৫ লক্ষ লোক হয়। আমাদের সংস্কৃতি প্রকৃতিকে পুজো করতেও শেখায়। এখন অনেকেই পরিবেশ দূষণ কার্বন নিঃসরণ ইত্যাদি নানা রূপ কথাবার্তা এবং সেমিনার করে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে, যার ফল খুব একটা কিছু হচ্ছে বলে মনে হয় না। যখন এসব শব্দ কেউ চিন্তাও করতে পারেনি তখন আমাদের মুনি ঋষিরা আমাদের জীবন শৈলীর মাধ্যমে প্রকৃতিকে পুজো করার পদ্ধতি শিখিয়ে গেছিলেন। বৃক্ষ প্রতিষ্ঠা, জলাশয় প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি নানারকম ভাবে। আমরা যারা আজকালকার দিনের লোক অনেকেই জানি না কিন্তু বাবা কাকাদের যদি জিজ্ঞাসা করি জানতে পারব যে আমাদের একটা পদ্ধতি ছিল পুকুরে স্নান করার সময় ডুব গেলে কয়েক মুঠি পাঁক পাড়ে ফেলা। বোঝাই যাচ্ছে ঢাক ঢোল পেটাতে হচ্ছে না মিটিং মিছিল করতে হচ্ছে না কয়েক মুঠী করে সবাই তার নিজের কাজ করলে আর ওই পুকুরকে মেইনটেনেন্স করতে হবে না। পুকুর স্বচ্ছ জলেই ভরা থাকবে। এমনি বলা হয় সাহিত্য সমাজের দর্পণ। প্রাচীন কাল থেকে আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতি যে ধরনের ধর্ম আশ্রিত প্রকৃতি আশ্রিত সাহিত্য ভান্ডার গড়ে তুলেছে, যা অধ্যয়ন করলে বোঝা যায় যে একটি নাটকের মধ্যেও কিভাবে মানুষকে শিক্ষা দেওয়া যায়। উদাহরণ হিসাবে বলতে পারি মহাকবি কালিদাসের লেখা অভিজ্ঞান শকুন্তলম। আজকের প্রেক্ষিতে দেখলে অনেকে বলবে হয়তো ওটা একটা সাধারণ প্রেমের গল্প। কিন্তু একটু গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যাবে যে আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতি এবং জীবনশৈলীর বিভিন্ন চেতনা যেমন - রাজধর্ম ঋষিধর্ম অতিথি সেবা বিবাহের বিভিন্ন রকম শাস্ত্র নির্দিষ্ট পদ্ধতি শাস্তি প্রায়শ্চিত্ত প্রকৃতি প্রেম, প্রকৃতির সাথে তাকে ধ্বংস না করে বসবাস করা ইত্যাদি নানা বিষয় এত সুন্দর ভাবে বর্ণিত আছে যে অবাক হতে হয়। এটিই হচ্ছে আমাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য।
শুধুমাত্র আমাদের হিন্দু জীবন শৈলী অনুসরণ করলে আর কোন দিকে তাকাতে হবে না কোন পটকাাস্ট দেখতে হবে না জীবন সুন্দরভাবে গড়ে উঠবে।
ষোড়শ সংস্কার বলে একটি কথা আছে। সংস্কার মানে আপনারা জানেন মানে কোন জিনিসকে যেটা আগে থেকেই আছে তাকে ঘষামাজা করা, বাসন মাজাও এক ধরনের সংস্কার। ঠিক সেরকম ব্যক্তি মানুষকে গড়ে তুলতে গেলে তারও ঘষামাজা প্রয়োজন। ভাবলে অবাক হতে হয় কি অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই সমস্ত বিষয় আমাদের মুনি ঋষিরা বানিয়ে দিয়ে গেছেন। আমাদের এই ঘষামাজা শুরু হয় কিন্তু জন্মের আগে থেকে যেটা আমরা অনেকেই জানিনা। গর্ভাধান পুংসবন সীমোন্তয়ন এই তিন ধরনের সংস্কার যদিও বর্তমানে প্রায় লুপ্ত কিন্তু জন্মানোর আগে হয়। শুধুমাত্র অন্নপ্রাশন উপনয়ন বিবাহ ইত্যাদি সংস্কার যেগুলো সমাজে বহুল প্রচলিত তার খবর আমরা রাখি। এরকম ষোলখানা সংস্কার আমাদের জীবনে আছে। যে কারণে শুধুমাত্র সংস্কার এবং তার শাস্ত্র নির্দিষ্ট পথ যদি আমরা জীবনে অনুসরণ করি তাহলে ওই যে আমাদের সংস্কৃতিতে আছে ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ সবই লাভ হবে। এবার জীবন শৈলীর নিত্যকর্ম পদ্ধতিতে আসি। হয়তো অনেকে বলবেন যে বর্তমান যুগে প্রাচীন জীবন শৈলী কী করে অনুসরণ করব, সে সম্বন্ধে আমি কিছুটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করব আপাতত বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি।। ত্রিসন্ধ্যা আহ্নিক সূর্যোদয়ের আগে সজ্জা ত্যাগ ব্যায়াম সাত্ত্বিক আহার এবং অধ্যয়ন এগুলো মোটামুটি ছাত্রদের কাজ। গৃহস্থ লোকের সঠিকভাবে সংসার প্রতিপালন করা উপার্জন সন্তানদের মানুষ করা বয়স্কদের সেবা করা সাধু সন্ন্যাসী মঠ মন্দির ইত্যাদির রক্ষণাবেক্ষণ এবং এই সমস্ত কাজ সামলে জপ তপ করা। মোটামুটি মধ্যবয়স পার হয়ে গেলে অর্থাৎ ধরে নিতে পারি পঞ্চাশের পর বানপ্রস্থ অর্থাৎ সংসার জীবন থেকে ধীরে ধীরে অবসর নেওয়া এবং শেষে গিয়ে সন্ন্যাস অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে ঈশ্বরের চরণে নিজেকে সমর্পণ করে মোক্ষ লাভের দিকে এগিয়ে যাওয়া। শুধুমাত্র এই ভাবেই যদি কেউ জীবন কাটায় কোনরূপ অন্য চিন্তা না করে, তার ঐহিক এবং পরমার্থিক উন্নতি লাভ হবে। সনাতন ভারতীয় হিন্দু জীবন শৈলীর যে সাত্ত্বিক খাদ্যাভ্যাস তা অনুসরণ করলে নিশ্চিন্তে বলা যায় কারো কোনদিন বদ হজমের ওষুধও খেতে হবে না প্রেসারও হবে না ডায়াবেটিস হবে না কোন দুর্ঘটনা জনিত সমস্যা ছাড়া স্বাভাবিক শরীরে কোনরূপ ব্যাধি এসে আক্রমণ করবে না। যদি রাত্তির বারোটার সময় বিরিয়ানি খাই তারপর কোল্ডড্রিংকস এবং আইসক্রিম অটোমেটিক বুকে চাপ লাগবে এবং কোলেস্টেরল বাড়বে। অ্যান্টাসিড ছাড়া কাজ হবে না। কিন্তু যদি রাত আটটা সাড়ে আটটার মধ্যে দুধ খই খেয়ে শুয়ে পড়ি সুন্দর ঘুমও হবে এবং শরীরও তরতাজা থাকবে।
হিন্দু জীবন শৈলী কিন্তু শুধুমাত্র কৃচ্ছ সাধনের কথা বলে না। উৎসবে আনন্দ অনুষ্ঠানে এবং বিভিন্ন পারিবারিক সমাগমেও আমাদের সুন্দর রাজসিক এবং কিছু ক্ষেত্রে তামসিক খাবারের ব্যবস্থাও দেওয়া আছে। সহজ ভাবে এক কথায় বলতে চাইলে বলা যেতে পারে যে মানুষের জীবনের যে স্বাভাবিক জান্তব প্রবৃত্তি তাকে কঠোরভাবে দমন না করে মানসিকভাবে আয়ত্তে নিয়ে এসে জীবন গঠন করা। এটাই মূল বিশেষত্ব আমাদের হিন্দু সংস্কৃতির এবং জীবন শৈলীর।
ঠিক এই জায়গা থেকেই আমি পরবর্তী আলোচনায় এগিয়ে যেতে পারি। একটা শ্লোক মনে পড়ছে"আহার নিদ্রা ভয় মৈথুনাদি সমস্তামেতদ পশুর্ভি নরাণাম
ধর্ম হি তথা মধিকো বিশেষা ধর্মে না হীনা পশুভি সমানা"
অর্থাৎ আহার নিদ্রা ভয় মৈথুন পশু ও মানুষ উভয়েরই সমান। ধর্ম হচ্ছে সেই বস্তু যা পশুর সাথে মানুষকে পৃথক করেছে। এই ধর্ম আমাদের মুক্তচিন্তা করতে শেখায়। এই ধর্ম আমাদের মানুষ হতে শেখায়। এই ধর্ম আমাদের নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে জীবন তৈরি করতে শেখায়। ধর্ম আমাদের ধারণীয় , তা কিন্তু উপাসনা পদ্ধতি নয়।
যে কারণেই মানুষের অবদমিত প্রবৃত্তিগুলোকে দমন করার বিভিন্ন পদ্ধতি অন্যান্য রিলিজিয়ানে যা আছে তার থেকে আমাদের ধর্মকে পৃথক করেছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে বর্তমানে এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে যে আমাদের সভ্যতা ৭ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো এবং দৃঢ় বিশ্বাস এটা ১০০০০ এর উপরে যাবে রিসার্চ চলছে, এ প্রসঙ্গে প্রসঙ্গান্তরে আলোচনা করা যাবে, সমসাময়িক সভ্যতা তো সম্ভব নয় কারণ আমরা প্রাচীনতম। কিন্তু মোটামুটি বলতে পারি যে আমাদের সভ্যতার কিছু পরে অর্থাৎ খ্রিস্ট জন্মের আগে আরও যেসব উন্নত সভ্যতা ছিল যেমন মেসোপটেমিয়া যেমন ইনকা ইত্যাদি তারা কিন্তু কালের গহ্বরের ধ্বংস হয়ে গেছে বহু যুগ আগে। অনেক নবীন সভ্যতা খ্রীষ্টজন্মের পরে তারাও কিন্তু ধ্বংস হয়ে গেছে।। কিন্তু হিন্দু সংস্কৃতি এবং হিন্দু জীবনশৈলী ধ্বংস হওয়া তো দূরে থাক প্রতিমুহূর্তে বিস্তার লাভ করছে এবং সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রসারণশীল সংস্কৃতি ও জীবনশৈলী হচ্ছে হিন্দুত্ব। জাতি ধর্ম দেশ কাল নিরপেক্ষ হয়ে যেখানেই মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে সচেতন হচ্ছে সে তার প্রাচীন ভাবধারা থেকে বা তার বিশ্বাসের পারিবারিক ভাবধারা থেকে বেরিয়ে এসে হিন্দু সংস্কৃতি অনুসরণ করা শুরু করছে। এর কারণ হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি যুক্তি ও প্রশ্নে স্বাধীনতা দেয়। আমাদের সংস্কৃতি বিভিন্ন রকম উপাসনা কে স্বীকৃতি দেয়। আমাদের সংস্কৃতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত এবং ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে জগতের প্রথম সারির বিজ্ঞানীরা হিন্দুত্ব অনুসরণ করেন এবং আমাদের বিভিন্ন ধর্ম পুস্তক নিয়ে চিন্তন করেন এবং সনাতনী ভাব ধারাতে আকৃষ্ট হয়ে এই মত প্রচারে সাহায্য করে আসেন। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেবো। এটা সিনেমাতেও এসেছে আপনারা যে কেউ দেখতে পারেন ইউটিউব বা ঠিক বলতে পারব না কোন অনলাইন প্লাটফর্মে আছে। কিন্তু পাওয়া যাবে, ওপেন হাইমার যাঁকে পরমাণু বোমার জনক বলা হয়। তিনি তাঁর বেডরুমে গীতা নিয়ে থাকতেন, যখন পরমাণু বিস্ফোরণ পরীক্ষামূলকভাবে হয় সেই সময় তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শনের স্লোক উল্লেখ করেছিলেন। google করলেই দেখতে পাবেন। আমাদের ধর্ম সংস্কৃতি সহনশীলতা শেখায় পরের মতকে শুনে নিয়ে নিজের মতন করে আত্মীকরণ করতে শেখায় ভাষা রীতিনীতি উপাসনা পদ্ধতি আচরণ বাসস্থান বিভিন্ন রকমের হলেও একই দর্শনের ছাতাতে আনার পদ্ধতি শেখায় কর্মফল এবং পুনর্জন্মের যে দৃঢ় বিজ্ঞানসম্মতভাবে পরীক্ষিত দর্শনের উপর আমাদের সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে আছে এবং পৃথিবীর বহু জ্ঞানীগুণী মনীষীদের বিভিন্ন পরীক্ষায় কষ্ঠি পাথরে উত্তীর্ণ এবং বহুত্ববাদ দ্বৈতবাদ অদ্বৈতবাদ বিশিষ্ট অদ্বৈতবাদ এবং ষটদর্শন এর ওপরে যে আমাদের সংস্কৃতির দৃঢ়ভিত্তি তার সাথে সাথে পারিবারিক সামাজিক মূল্যবোধ সমৃদ্ধ শাস্ত্র এবং সাহিত্য আমাদের অমর করে তুলেছে। জীবনশৈলীর ক্ষেত্রেও একই কথা বলতে পারি,এখানে একটু আধুনিক জীবনে কি করে প্রাচীন জীবনশৈলী অনুসরণ করা যায় তার উপরে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করব। দেখুন বাল্যকালে যখন আমরা ছাত্রাবস্থায় তখন পড়াশোনা করতে হবে এবং শরীর গঠন করতে হবে। এবং দেশপ্রেম আনতে হবে। এটা আগেও যা ছিল এখনো মোটামুটি তাই আছে। যে সে সময় মন দিয়ে পড়াশোনা করে তারা পরবর্তী জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় এই জায়গাটা খুব একটা পাল্টায়নি ইদানিং কালে বাচ্চাদের মোবাইলে অতিরিক্ত আসক্তি এবং আমাদের প্রাচীন পারিবারিক বন্ধন ভেঙে গিয়ে অণু পরিবার হওয়ার ফলে যেটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আশা করি দ্রুত মিটে যাবে সেটুকু ছাড়া। সমস্যাটা প্রধানত শুরু হচ্ছে গার্হস্থ জীবন এবং বানপ্রস্থ এই জায়গাটাতে।
অতিরিক্ত লোভ এবং বিষয়ের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি আমাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পাশ্চাত্য দর্শন সবকিছু ধ্বংস করে ভোগ করতে শেখায়। এবং ভোগ আরো ভোগ আরো ভোগ অতৃপ্তি আরো অতৃপ্তি আরো অতৃপ্তি ডেকে নিয়ে আসে। আগুনে ঘি দিলে আগুন কখনো নিভবে না আরো জ্বলবে। আমাদের উপনিষদের বাণী হচ্ছে তেন ত্যক্তেনো ভুঞ্জিতা। আমরা যদি আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতি কিছুটা অনুসরণ করি, আরো বড় ফ্ল্যাট আরো বড় গাড়ি আরো কয়েকটা এসি এগুলো ছেড়ে দিয়ে পরিবারের সাথে থাকা মূল্যবোধকে সম্মান দেওয়া সন্তানদের সঠিক দিকনির্দেশনা করা অবসর সময় শাস্ত্র অধ্যায়ন যাকে সাধ্যায় বলা হয় সেটা করি তাহলে কিন্তু আমাদের ৩০ দিন টার্গেটের পেছনে ছুটতে হবে না, প্রয়োজন একটু কম করতে পারি তাহলে শান্তি একটু বেশি আসবে আর ঈশ্বর যখন প্রাণ দিয়েছেন তিনি সব কিছু যোগান দেবেন আপনার প্রয়োজন অনুসারে। ফর্টিহ ক্রাইসিস বলে একটা কথা খুব চালু এখন হয়েছে। ৪০ বছর হয়ে গেলে মানুষের মধ্যে অনেক রকম ফ্রাস্টেশন আসছে, কি হবে কি হবে ভাব। তার কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত ভোগ। পঞ্চাশের পরে যদি সব কিছু ত্যাগ করতে শুরু করি তাহলে অর্থের প্রয়োজনটাই তো ফুরিয়ে যাবে যে সামান্য অর্থ হয়তো সঞ্চয় আছে তা দিয়ে জীবন দিব্যি চলে যাবে, ওষুধ খেতে হবে না। সেই জন্য আমাদের আবার মূলে ফিরতে হবে। সন্ধ্যা বেলায় বাড়ি ফেরার সময় একটা স্টপেজ আগে যদি নামি হাঁটা হয়ে যাবে, লিফ্টে করে না উঠে যদি সিঁড়ি দিয়ে উঠি ইলেকট্রিকও বাঁচবে শরীর ভালো থাকবে। বাজার থেকে প্লাস্টিক না নিয়ে যদি একটা কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করে রেখে দিই এবং ওটা কেচে নিয়ে ব্যবহার করি তাহলে পরিবেশও বাঁচবে অর্থ বাঁচবে সবারই উপকার হবে । ছোট ছোট জিনিসে পরিবর্তন আনতে হবে। এবং নিজেকে ভাবতে হবে যে কি করে আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে এরকম ভাবে জীবন তৈরি করা যায়। অনেকে বলে কাল অনেক রাত অব্দি কাজ করেছি। একটা অনুরোধ রইল খাতা পেন্সিল নিয়ে কতক্ষণ কাজ করেছেন লেখার চেষ্টা করবেন তো, দেখবেন কাজ হয়তো আধঘন্টা করেছেন মোবাইল স্কোল করেছেন ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট। যদি তর্কের খাতিরে ধরেই নিই যে রাত্রি একটা অব্দি কাজ করেছেন ঘুম থেকে উঠতে আপনার বেলা হয়ে গেছে আটটা কিন্তু যদি এগারোটায় শুয়ে পড়তেন এবং পাঁচটায় উঠতেন তাহলে শরীর মন কাজ পরিবেশ এবং অর্থ (কারণ ইলেকট্রিসিটি বাঁচতো), ইত্যাদি সবেরই সাশ্রয় হতো, আমরা একটু ভেবে দেখতে পারি।
প্রাচীন কাল থেকে আচার্য প্রণবানন্দ স্বামী বিবেকানন্দ আদি শংকরাচার্য আদি কবি বাল্মিকী মহামুনি বেদব্যাস এনারা যে ভারতীয় সংস্কৃতি এবং জীবন ধারা নিজেদের জীবনে অনুসরণ করে আমাদের জন্য দেখিয়ে দিয়ে গেছেন তা কিন্তু কণ্টকাকীর্ণ নয়। কুসুমাস্তীর্ণ। আমাদের শুধু কর্তব্য সেই পথে হেঁটে গিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন সুন্দর করে তোলা আমাদের সংস্কৃতির সুমহান ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা প্রসারিত করা এবং শক্তিশালী জাতি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করা।
আমরা সঙ্ঘের বর্গের বৌদ্ধিক অনুষ্ঠানে আছি। সুতরাং হিন্দু সংস্কৃতি এবং জীবন শৈলীর ওপর সংঘের কি কাজ সেই নিয়ে কয়েকটা কথা বলতেই হবে।
আমাদের যে হিন্দু সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ ধর্ম সত্য অহিংসা দয়া আত্ম সংযম এটা প্রায় ভুলতে বসে ছিলাম এবং জাতি হিসেবে পরাধীন হয়েছিলাম। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ আমাদের জাতীয় ঐক্য তৈরি করে আমাদের আত্মবিশ্বাস আধ্যাত্মিকতার চরিত্র গঠন এবং জাতীয় জীবনে জাতীয় চেতনা সমৃদ্ধ করার কাজ শুরুর দিন থেকে করে আসছে নিরলস ভাবে। আমাদের শাখা শুরু হয় শারীরিক কিছু অনুশীলনের মাধ্যমে।। এবং শেষ হয় প্রার্থনার মাধ্যমে। কি রকম ভাবে আমাদের জীবন গঠন করা উচিত। আত্মানাং মোক্ষার্থায় জগদ্ধিতায় চ এর আয়োজন। নিজেকে মুক্ত করো তার সাথে সাথে জগতের উপকার করো। আপনাদের মনে থাকবে আলোচনার শুরুতে আমি সমায়ুনুবর্তিতা নিয়ে একটা উল্লেখ করেছিলাম, বুঝতে পারছেন যে আমরা এখানে সবাই প্রায় বাঙালি বসে আছি কিন্তু ঘড়ির কাঁটা ধরে আমরা চলছি। আমাদের জীবন শৈলী সঙ্ঘ শিক্ষার মাধ্যমে পরিবর্তন করে ধীরে ধীরে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি চরিত্র হিসেবে সমায়ুনুবর্তিতা গড়ে তুলছি, এ অবশ্যই সংঘের অবদান।সুতরাং আমরা যদি সঙ্ঘ নির্দিষ্ট যে পথ, সেই পথে চলতে পারি তাহলে যে সুমহান জাতি হিসেবে প্রাচীনকাল থেকে আমরা যে জগৎকে পথ দেখিয়ে এসেছি এবং জগতের গ্লানি দূর করে তাকে সত্যের পথে নিয়ে যাওয়ার যে সাধনা আমাদের প্রাচীন মুনি ঋষি রা শুরু করেছিলেন তা পুনরায় প্রবর্তন করতে পারব এবং তার লক্ষণ বর্তমানে দিকে দিকে দেখা যাচ্ছে।
সবশেষে বলতে পারি আমাদের এই হিন্দু সংস্কৃতি এবং জীবন শৈলী কেবল ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক জীবন দর্শন, এর দিকভিত্তি মানুষকে সত্যের অনুসন্ধান যুক্তিবাদ সহিষ্ণুতা আত্মজ্ঞান এবং সারা জীবন শিক্ষা গ্রহণের পথে পরিচালিত করে। তাই হিন্দু জীবনশৈলী শক্তির বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশের পাশাপাশি সমাজে জ্ঞান নৈতিকতা ও মানব কল্যাণ প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধন্যবাদ। আপনারা সকলে ভালো থাকবেন। ভারত মাতা কি জয়
গ্রুপে দেখলাম পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছা জানানো নিয়ে একটা কনফিউশন হচ্ছে সেই জন্য এই সংক্ষিপ্ত লেখাটার পরিকল্পনা করলাম। প্রথমেই বলি ১৪ এপ্রিল বা ১৫ এপ্রিল যদি কেউ পয়লা বৈশাখ উইশ করে বা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায় সেটা খুব একটা ভুল কারোর তরফেই নয়। দুটোই ঠিক,কারণটা একটু আলাদা। ছোটবেলায় তো আমরা দেখতাম ১৪ই এপ্রিল মোটামুটি পয়লা বৈশাখ হত এখন কি করে পনের এপ্রিল হয়ে গেল বাংলাদেশে তো ১৪ই এপ্রিল হচ্ছে। এটা বুঝতে গেলে আমাদের বর্ষ গণনা পদ্ধতি গুলো সম্বন্ধে একটু জানতে হবে।
আমাদের প্রাচীন শাস্ত্র বা জ্যোতির্বিদ্যার গণনা অনুসারে বছর গণনা অনেকগুলো পদ্ধতিতে হয়। সবগুলোর বিস্তৃত বিবরণ দেওয়ার পরিসর নেই শুধুমাত্র আমাদের প্রয়োজনটুকুই লিখছি।
১) সৌর বৎসর (অর্থাৎ বৈশাখ থেকে শুরু হয়ে চৈত্র পর্যন্ত সূর্যদেবের রাশি সঞ্চরণকাল, সময়কাল ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৯ মিনিট)
২) নক্ষত্র সৌর বৎসর(এটাও বৈশাখ থেকে শুরু হয়ে চৈত্র পর্যন্ত যায় কিন্তু হিসেবটা নক্ষত্রের সঞ্চরণ সময় অনুসারে, সময়কাল ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টা ৯ মিনিট, খেয়াল করুন দুটোর মধ্যে প্রায় কুড়ি মিনিটের তফাৎ)
৩) মুখ্যচান্দ্র বৎসর (সময়কাল মোটামুটি ৩৫৪ বা ৩৮৪ দিন, এটি মুখ্য চান্দ্রচৈত্র মাসের শুক্লা প্রতিপদে শুরু হয়।)
আরো কয়েকটা হিসাব আছে যেমন সায়ন বৎসর ইত্যাদি সেগুলো আমরা আলোচনায় আনছি না ওগুলোর অন্য প্রয়োগ আছে।
ঋতুচক্র অনুযায়ী যে বছর হিসেব হয় যাকে আমরা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার হিসেবে ও জানি সেটা কিন্তু এক নম্বর পয়েন্ট। ভারতবর্ষে ১৯৫২ সালে প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর তত্ত্বাবধানে ডক্টর মেঘনাদ সাহা এবং প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ নির্মল চন্দ্র লাহিড়ী মহাশয়ের সভাপতিত্বে যে পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি তৈরি করা হয় তাদের হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশ গভর্মেন্ট বা ভারত সরকারের পঞ্জিকা রচনা করা হয়। বিভিন্ন কারণবশত পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেটা গ্রহণ করেনি। প্রাচীন সূর্যসিদ্ধান্ত গ্রন্থের হিসেব অনুসারে এখানে সরকারি ছুটি বা অন্যান্য হিসাব করা হয়। যাই হোক সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ পরে আলোচনা করা যেতে পারে। বোঝাই যাচ্ছে যে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার এর হিসাব প্রায় নির্ভুল হওয়ার জন্য বাংলাদেশের নববর্ষ সারা জীবন ১৪ই এপ্রিল থাকবে। সুতরাং ১৪ এপ্রিল যদি কেউ নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায় সেটা ঠিক, কোন ভুল না।
এবারে আসি দু'নম্বর পয়েন্টে। আমরা নববর্ষ পালন করি ওই নক্ষত্র বৎসর অনুসারে। দেখুন সৌর বৎসরের সাথে তার প্রায় কুড়ি মিনিটের তফাৎ। সাধারণ যোগগুণের অংক করলে বোঝা যাবে যে ৭২ বছরে একদিনের পার্থক্য হয়ে যাবে। যে কারণে আমাদের ছোটবেলায় ১৪ই এপ্রিল হত(মোটামুটি ১৯৫০ সালের আশপাশ থেকে) আর এখন যারা সবে জন্মাচ্ছে তারা যখন অনেকটা বৃদ্ধ হয়ে যাবে তখন দেখবে আমাদের পয়লা বৈশাখটা ১৬ই এপ্রিল হবে। কিন্তু যেহেতু এই পয়লা বৈশাখ উদযাপনটা আমাদের শুধুমাত্র আচার অনুষ্ঠান আর পূজো আচ্ছা কেন্দ্রিক সেই জন্য কোন অর্থনৈতিক হিসাবে সমস্যা তৈরি করে না। আর তাছাড়া মোটামুটি একটা জেনারেশন তো বটেই আর একটা জেনারেশনের যুবক বয়স পর্যন্ত দিনটা পাল্টাচ্ছে না। তাই ১৫ ই এপ্রিল যদি কেউ পয়লা বৈশাখের উইশ বা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায় বর্তমানে সেটাও একসেপটেড বা গ্রহণীয়।
এবার আসি তিন নম্বর পয়েন্টে। দেখবেন সাধারণত বাঙ্গালীদের পয়লা বৈশাখের সাথে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের নতুন বছরের আরম্ভ ঠিক মেলে না। এটা আমরা বিভিন্ন নামেও জানি । আমাদের যেমন পয়লা বৈশাখ আসামে তেমনি বিহু চাকমারা বলে বিজু মহারাষ্ট্রে বলে গুডি পারবা দক্ষিণ ভারতে যোগাদী বা উগাধি জম্মু অঞ্চলে নওরেহ ইত্যাদি। এর কারণ কিন্তু আমাদের বিভিন্ন হিন্দু উৎসব যে চান্দ্র মাস অনুসারে হয় সেই একই কারণ চৈত্র শুক্লা প্রতিপদে। খেয়াল করে দেখুন দুর্গাপুজোর টাইম কিন্তু ফিক্স না, আগু পিছু করে। এবারে যেমন পিছিয়ে গেছে। তিন নম্বর পয়েন্টটা পড়লে দেখবেন, বছরে দিনের সংখ্যার হিসেব দুটো লিখেছি। ৩৮৪ দিন হিসেবটা এডজাস্ট হয় মলমাসে যেটা এ বছর হচ্ছে। (বিস্তৃত জানতে আমার মলমাস সংক্রান্ত একটা লেখা ব্লগে আছে আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন)। তাই আমাদের বাঙ্গালীদের সাথে ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যের বছরের শুরুর দিনটা ঠিক মিলতে চায় না। কিন্তু তারাও যে ঠিক করে এবং আমরাও যে তাদেরকে ওই দিনটাতে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাতে পারি বা এখন যেহেতু কার্যোপলক্ষে আমরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহরে থাকি তাই ওরাও যদি আমাদের শুভেচ্ছা জানায় আমাদের সেটা আনন্দমনেই গ্রহণ করা উচিত। আর একটা ছোট্ট তথ্য ওই যে বিহু,বিজু শব্দগুলো লিখেছি এগুলো কিন্তু "বিষুব" শব্দের অপভ্রংশ কারণ প্রাচীনকালে যখনই হিসেবগুলো মোটামুটি শুরু হয়েছিল এগুলো একুশে মার্চের আশেপাশে। কারণ একুশে মার্চ দিনরাত্রি সমান। ধরে নিতে পারি প্রথম পয়লা বৈশাখ ২১ শে মার্চের আশেপাশেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ভেবেছিলাম অল্প কথায় শেষ করব কিন্তু করতে পারলাম না ক্ষমা করবেন আশা করি কিছুটা বোঝাতে পারলাম। আসুন সবাই মিলে আমরা আজকে আমাদের বাঙালি পয়লা বৈশাখে খুব আনন্দ করি, নতুন জামা পরি, ভালো খাওয়া দাওয়া করি এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন আমরা সবাই ভালো থাকি,সুস্থ থাকি আনন্দে থাকি। প্রত্যেকে ভাল থাকবেন, আনন্দে থাকবেন। ধন্যবাদ। শ্রী সুমিত মুখার্জ্জী
গুরু শিষ্য পরম্পরা
ওঁ অহৈতুকিং প্রেমঘন দিব্যমূর্তিং।দ্বিতীয় কথা হলো বর্তমানে যেটাকে পার্সোনালাইজড কেয়ার বলা হয় অর্থাৎ প্রত্যেক ছাত্রের যোগ্যতা অনুসারে তাকে আলাদা করে শিক্ষা দান কোন গতানুগতিক সিলেবাসে ঢালাই করা নয় এটা কিন্তু গুরুকুলে খুব গুরুত্ব সহকারে দেখা হতো। এখানে একটা কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না যে আমাদের প্রাচীন শিক্ষায় গুরু শিষ্য পরম্পরায় যে সমস্ত পদ্ধতি গুলো অনুসরণ করা হতো বর্তমানে উন্নত পাশ্চাত্যে শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। একটা ছোট উদাহরণ, আমাদের পরম্পরাতে বিদ্যারম্ভের কাল নির্দিষ্ট করা হয়েছে পাঁচ বছর বয়সে।বর্তমান বিজ্ঞানও বলছে যে পাঁচ বছর বয়স না হলে একটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পূর্ণ হয় না। ইদানিং কালে আমরা যে দেখতে পাচ্ছি দেড় বছর দু বছরে কোনো রকমে হাতে খড়ি দিয়েই একটা চাইল্ড প্লে স্কুল বা কোথাও ভর্তি করে দেয়া হচ্ছে সেটা কিন্তু বিজ্ঞানসম্মতভাবেও ঠিক নয় এবং শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে পরিপন্থী। যাইহোক আমাদের বিষয়ে ফিরে আসি। মোটকথা প্রাচীন গুরু শিষ্য পরম্পরায় শিশুর মানসিক শারীরিক সমস্ত যোগ্যতা বিচার করে গুরু তাকে আলাদা করে শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করতেন। এরপরে অবশ্যই বলতে হয়,এই পদ্ধতিতে শিক্ষাদান হলে গুরু শিষ্যের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বিশ্বাস এবং ভালোবাসা যে স্তরে উন্নতি হয় সেটা স্বাভাবিকভাবে বর্তমান পদ্ধতিতে কখনোই পৌঁছবে না। বর্তমানে আমরা গুরু শিষ্যের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে চূড়ান্ত অবনতি বা অবক্ষয় দেখতে পাচ্ছি সেটা আমাদের এই প্রাচীন পরম্পরা অস্বীকার করারই ফল।
প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত অত্যন্ত জনপ্রিয় বিভিন্ন উদাহরণ দেওয়ার আগে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের কথাটা উল্লেখ না করে পারছি না। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন কথাটা বললে আমাদের প্রাচীন গুরু শিষ্য পরম্পরায় যে কি যাদু ছিল আমরা আর কিছু ব্যাখ্যা না দিলেও বুঝতে পারি।আরো কয়েকটা উদাহরণ দিচ্ছি ।আপনাদের কাছে বিষয়টা আরেকটু প্রাঞ্জল হবে। যদি একদম প্রাচীনকালে পৌরাণিক সময়ে ফিরে যাই তাহলে ভগবান শ্রী রামচন্দ্র এবং তাঁর গুরু বশিষ্ঠর কথা উল্লেখ করতেই হয়। এরপরে শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর গুরু সন্দীপনী মুনির কথা। তারপর ঐতিহাসিক কালে ফিরি। চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যাবে চাণক্য এবং চন্দ্রগুপ্তের কথা। যে উদাহরণগুলো আমি দিচ্ছি এনাদের নামই যথেষ্ট আমার এনাদের ব্যাখ্যা দেওয়ার মতন যোগ্যতা নেই আমরা প্রত্যেকেই তা জানি।
একদম আধুনিক কালের দিকে যদি চোখ রাখি তাহলে ভগবান ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এবং তাঁর বিশ্ব বিজয়ী শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ।। আর যদি আমাদের সময় দাঁড়াই তাহলে কিন্তু আমরা দেখতে পাবো এখনো বিশ্ব বিখ্যাত কিছু জুটি দাপাচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে পন্ডিত রবি শংকর এবং জর্জ হ্যারিসনের কথা। গুরু শিষ্য পরম্পরার কি আশ্চর্য অনুসরণ।উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি পন্ডিত শ্রী বিজয় কিচলুর কথা। এই যে এখানে বসে আমরা কথা বলছি এর থেকে একটু দূরে টালিগঞ্জের যে সংগীত রিসার্চ একাডেমি তার প্রতিষ্ঠাতা গুরু শিষ্য পরম্পরার আরেক আশ্চর্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন এবং তার গর্বের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। এরকম বহু কথা এবং উদাহরণ দেওয়া যায় এই গুরু শিষ্য পরম্পরা নিয়ে। সময় সংক্ষিপ্ত। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে হয়তো সেই প্রাচীনকালের মতো ওভাবে আর গুরু শিষ্য পরম্পরা আমাদের পক্ষে নতুন করে সার্বিক ভাবে তৈরি করাটা খুব অসুবিধা জনক, অসম্ভব বলবো না কারণ পৃথিবীতে অনেক কিছু ঘটনা এখনো ঘটানো যায় আমাদের ইচ্ছে শক্তি প্রবল হলে। টাটকা উদাহরণ প্রাচীন হিব্রু ভাষাকে পুনরুদ্ধার করে জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে লাগানো ইজরাইলের অধিবাসী ইহুদীগণ। যাইহোক যদি আমরা কিছুটা হলেও সেই পরম্পরা অনুসরণ করতে পারি তাহলে আজকের দিনে দাঁড়িয়েও কিন্তু আমরা তার উপকার থেকে বঞ্চিত হব না। এই ধরনের পদ্ধতি আজকের দিনেও কেন গুরুত্বপূর্ণ তার উপরে কয়েকটা কথা এবার বলব।প্রথম কথা,এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে অনুসারী শিক্ষাদান যেমন জ্ঞান দক্ষতা সংগীত নাচ আঁকা দর্শন যোগ আধ্যাত্মিকতা এভাবেই সমৃদ্ধি লাভ করেছে।গতানুগতিক সিলেবাস হলে আমাদের এত সমৃদ্ধি এই সমস্ত বিষয়ে হতো না। দ্বিতীয়তঃ একটু আগে যে বললাম পার্সোনাল লার্নিং বা ব্যক্তিগতভাবে ছাত্রের যোগ্যতা অনুসারে শিক্ষা দান গুরু শিষ্য পরম্পরা ছাড়া প্রায় অসম্ভব। তৃতীয়তঃ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।নিজেদের সংস্কৃতিকে ভুলে গেলে সেই জাতি শেষ হয়ে যায় এটার উদাহরণ পৃথিবীতে বহু আছে ।
চতুর্থত আধ্যাত্মিক পরম্পরা। এই বিষয়টি গুরু শিষ্য ঘনিষ্ঠভাবে না থাকলে প্রায় অসম্ভব। পঞ্চমত আমাদের নিজস্ব যে প্রথাগুলো সেগুলোর সংরক্ষণ এবং তার উন্নতি সাধন।। আর সবার শেষে আর একটা কথা না বলে পারছি না। এই সমস্ত বিষয়গুলো সর্ম্পকে আমাদের মূল যে লক্ষ্য সবারই হওয়া উচিত অর্থাৎ চারিত্রিক উন্নতি সাধন এবং দৃঢ়তা সেই লক্ষ্যে নিয়ে যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করে আমি আমার বক্তব্য শেষ করব।একটি বিষয় প্রায়ই আমরা শুনতে পাই যে কোন শিষ্য অনুযোগ করছেন গুরুদেব আমার প্রতি সদয় নন উনি ওকে বেশি ভালোবাসেন আমাকে একটু কম স্নেহ করেন ইত্যাদি । অথবা আমি মনে হয় কোন দোষ করেছি তাই আমার দিকে দৃষ্টি দেন না আমাকে উল্টোপাল্টা কাজ দেন, মূল যে শিক্ষার কাজ তা আমাকে শেখান না বা দেখেন না ।এই প্রসঙ্গে দুই একটা কথা বলতেই হবে ।গুরুদেব কারুর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেন না বা কাউকে কম ভালোবাসেন বেশি ভালোবাসেন এরকম হয় না ।গুরুদেব হচ্ছেন দিবাকরের মতন। সূর্যদেব যেমন আলো সবার জন্য সমান ভাবে দেন তাঁর কৃপাদৃষ্টি থেকে কেউই বঞ্চিত হয় না, দরিদ্রের পর্ণকুটির থেকে ধনীর অট্টালিকা পর্যন্ত সমান ভাবেই আলো এসে পড়ে,সেরকম গুরুদেবের স্নেহ এবং তাঁর কৃপাদৃষ্টি প্রত্যেক শিষ্যের বা ছাত্রের ওপর সমানভাবেই পড়ে। এটা আমাদের ব্যর্থতা যে আমরা গুরুদেবের স্নেহ সবসময় নিতে পারি না ।কারন আমরা সেরকমভাবে যোগ্য পাত্র হিসেবে নিজেদের তৈরি করতে অপারক হয়েছি। দুটো উদাহরণ দিই বিষয়টা আরেকটু ভালোভাবে বোঝা যাবে। একটা উদাহরণ সিনেমা জগৎ থেকে দিচ্ছি ।একটা বিখ্যাত সিনেমা "রিটার্ন টু দি 36 চেম্বার" যেখানে দেখানো হচ্ছে যে একটি সাওলিন টেম্পলে যেখানে মার্শাল আর্ট শেখানো হয় ওরকম একটা জায়গাতে একটি ছাত্রকে তার গুরু প্যান্ডেল বা বাঁশ বাঁধতে দিয়েছেন এবং তার ওটাই কাজ কোনো রকম তাকে শেখাচ্ছেন না মার্শাল আর্ট ।বাঁশের প্যান্ডেল থেকে নামলেই গুরু তাকে শাসন করেন এবং তাকে বাঁশের উপরেই থাকতে বলেন অন্যান্য ছাত্রদের মার্শাল আর্ট তিনি মন দিয়েই শেখান। শিষ্যের এই নিয়ে অনুযোগ অভিযোগের অন্ত নেই এবং বাকিরাও তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। শেষে দেখা যায় যে সেই ছাত্রটা এত ভালোভাবে মার্শাশ আর্ট শিখেছে যে সে একা সমস্ত ছাত্রদের থেকে অনেক আগে অ্যাডভান্স তৈরি হয়ে গেছে এবং সেই প্রথম স্থানাধিকারী ।তখন সে বুঝতে পারে যে গুরুদেব তাকে ওই ভাবেই ট্রেনিং দিয়েছিলেন যেটা শুধুমাত্র তার জন্য স্পেশাল ট্রেনিং ছিল অন্যদেরকে সেটা দেননি। আরেকটি উদাহরণ আধ্যাত্মিক জগত থেকে দেবো আমার পরম পূজনীয় আচার্যদেব ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী শ্রী প্রণবানন্দজী মহারাজের ।ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রতিষ্ঠাতা আচার্যদেব শ্রী শ্রী প্রণবানন্দজীর গুরুদেব হলেন স্বামী গম্ভীরানন্দজী।গোরক্ষপুর মঠাধীস।তিনি তাঁর গুরুগৃহে যখন ছিলেন তখন সমস্ত ছাত্রকে সেখানে আশ্রমের কাজ যাবতীয় কাজ করতে হতো ।শুধুমাত্র গুরু মহারাজ কোন কাজ করতেন না তিনি তার সাধনভজন নিয়ে থাকতেন। এই নিয়ে বাকি শীষ্যদের অভিযোগের অন্ত ছিল না ।তাঁরা সবাই একদিন গম্ভীরানন্দজীর কাছে অভিযোগ জানাতে গেল ।যে আমাদের সমস্ত আশ্রমের কাজ করতে হয় আর ওই যে বিনোদ সাধু এসেছে বাংলা থেকে তাকে কোন কাজ করতে হয় না সে শুধু তার সাধন ভজন নিয়েই থাকে ।তার প্রতি এরকম পক্ষপাতিত্ব কেন গুরুদেব ? গম্ভীরানন্দজী হেসে বললেন যে ও জন্ম থেকেই সিদ্ধ পুরুষ ।শুধুমাত্র সামাজিক পরম্পরা এবং গুরু শিষ্য পরম্পরা উলঙ্ঘন করবে না বলে এখানে ও এসেছে ।ও সাধারণ লোক না ওর সময়ও খুব মূল্যবান ।ওর এখানে আসার উদ্দেশ্য হচ্ছে লোকশিক্ষা যে সামাজিক ব্যবস্থা এবং আমাদের গৌরবোজ্জ্বল পরম্পরা অনুসরণটা সবাইকে করতে হয়। শিষ্যরা তাদের ভুল বুঝতে পারে এবং তারপর দুজনের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে তারা যে যার কাজে চলে যায় ।বুঝতেই পারছেন যে দুক্ষেত্রেই কিন্তু গুরুদেব সঠিক ছিলেন এবং কারুর প্রতি কোন পক্ষপাতিত্ব করেননি এবং যার যার যোগ্যতা অনুসারে তিনি ব্যবস্থা দিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদেরও কোন কারনেই আমাদের গুরুদেবের প্রতি অভিমান বা সংশয় প্রকাশ করা উচিত নয়। আমাদের বোঝার ভুল যেমন ছোট শিশু আইসক্রিমের জন্য বায়না করে বোঝে না যায় আইসক্রিম খেলে তার ঠান্ডা লাগবে ,অনেকটা সেরকম ।গুরুর প্রতি সর্বদা অচলা নিষ্ঠা থাকতে হবে এবং গুরুর বাক্য সর্বদাই অনুসরণ করতে হবে তবেই আমাদের ঐহিক এবং পরমার্থিক উন্নতি ।
সবশেষে এই গুরু পূর্ণিমার পূণ্য লগ্নে ভগবান শ্রী ব্যাসদেবের স্মৃতি বিজড়িত এই পূণ্য তিথিতে সমস্ত গুরুর কাছে আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করে আশীর্বাদ প্রার্থনা করছি যে আপনাদের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আমরা যেন ভারতবর্ষের এই সনাতনী প্রথা কে আবার যতটা সম্ভব পুনর্প্রবর্তন করতে পারি। ওম হর গুরো শংকর শিব শম্ভু। ওম গুরো কৃপাহি কেবলম। ধন্যবাদ। নমস্কার।
উপনয়ন শব্দার্থ :- "ব্রহ্মচারী চরতি বেবিষদ্বিষঃ স দেবানাং ভবত্যেকমজ্ঞম্"(ঋগ্বেদ ১০/১০৯/৫) ব্রহ্মচারী ব্রহ্মচর্য পালনের ফলে দেবতাদের এক অঙ্গ হয় "উপ" অর্থাৎ গুরুর নিকট "নয়ন" মানে আনা , - বেদ অধ্যয়নের জন্য গুরু গৃহে বালককে নিয়ে আসার সময় যে সংস্কার করানো হতো তাকে উপনয়ন বলা হয়।এই সংস্কারের পর থেকেই একটি বালকের পড়াশোনা শুরু হতো। আজকের দিনের প্রেক্ষিতে ধারণা করতে পারি,আবাসিক বিদ্যালয়ে ভর্তির আগে যে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বালকদের যেতে হয় সেটারই প্রাচীন রূপ হল উপনয়ন। যদিও পরবর্তীকালে এর উদ্দেশ্য এবং ব্যবহার অনেক পরিমার্জিত এবং পরিবর্তিত হয়েছে।পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যেও আমরা এই ধরনের সংস্কার দেখতে পাই ।যেমন পার্সিদের মধ্যে "নৌজাত" বলে এই ধরনের একটি সংস্কার আছে ।
যাই হোক এই প্রবন্ধের প্রধান উদ্দেশ্য নারীদের উপনয়নের বিষয়ট নিয়ে আলোচনা করা ।এই ব্যাপারে বিভিন্ন স্মৃতি গ্রন্থে বিভিন্ন রকম মতের কিছু বিরোধ লক্ষ্য করা যায় ।তবে মোটের উপর সমস্ত স্মৃতিগ্রন্থই প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে নারীদের উপনয়নের পক্ষেই মত দিয়েছেন বলে আমাদের মনে হয়। স্মৃতিকার হারীতের স্মৃতিচন্দিকা নামক গ্রন্থে ব্রহ্মবাদিনী এবং সদ্যোবধু এই দুই ধরনের স্ত্রী জাতির যে বিভাগ করা হয়েছে তাতে কিন্তু উপনয়নের পরিষ্কার ইঙ্গিত বর্তমান। ব্রহ্মবাদিনী যাঁরা ছিলেন তাঁদের বালিকা বয়স থেকেই বেদ পাঠ করানো হতো এবং শাস্ত্র সংক্রান্ত পাঠ তাঁদেরকেও শেখানো হতো।। আর যাঁরা সদ্যবধূ ছিলেন তাদের বিয়ের আগে সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান করে উপনয়নের ব্যবস্থা করা হতো।। ঠিক যেরকম আজকের দিনেও দেখতে পাই অনেক পরিবারে কোনো পুরুষের যদি সঠিক বয়সে উপনয়ন করানো না হয় বিবাহের আগে সংক্ষিপ্ত আকারে তার উপনয়ন দেওয়া হচ্ছে।।
"হারীতেনোক্তম্ - দ্বিবিধাঃ স্ত্রিয়ো ব্রহ্মবাদিন্যঃ সদ্যোবধ্বশ্চ। তত্র ব্রহ্মবাদিনীনাম্ উপনয়নম্ অগ্নীন্ধনম্ বেদাধ্যয়নম্ স্বগৃহে চ ভিক্ষাচর্যা ইতি। সদ্যোবধূনাম্ তু উপস্থিতে বিবাহে কথংচিৎ উপনয়নমাত্রং কৃত্বা বিবাহঃ কার্যঃ" আজও বিবাহে হোমের সময় একটি বিশেষ মন্ত্র ( সোমোদদদ্ গন্ধর্বায়, গন্ধর্ব দদদগ্নয়ে। রয়িঞ্চ পুত্রাংশ্চাদদাদ্, অগ্নির্মহ্যথো ইমাম্ ) পাঠের আগে করণীয় কর্মের বিবরণে যে কোন বই খুললেই দেখা যাবে যে লেখা আছে,"বধু বিবাহের সময় উত্তরীয় বস্ত্র উপবীতের মতন ধারণ করে বসবেন"।
গোভিলের গৃহ্যসূত্রে ওই মন্ত্রের উপস্থাপনায় পরিষ্কার ওইখানে উত্তরীয় বদলে উপবীত বলা আছে। পরবর্তীকালের স্মৃতিকারেরা হয়তো বিভিন্ন কারণে এই বিশেষ উপস্থাপনার টিকা করার সময় ওটাকে বদলে দিয়ে উপবীতের জায়গায় উত্তরীয় করে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে রঘুনন্দন সরাসরি স্ত্রী লোকের যজ্ঞপোবীত ধারণের বিষয় নিয়ে আলোচনা খুব একটা করেননি।
তবে এই নিয়ে কিছু বলার আগে অবশ্যই আমাদের মাথায় রাখতে হবে রঘুনন্দনের সমসাময়িক বঙ্গভূমি তথা ভারতবর্ষের আর্থসামাজিক এবং বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণটাই ঘন মেঘাচ্ছন্ন ছিল।তাই হয়তো বিশেষ কোনো কারণে তিনি এই ব্যাপারে আলোকপাত করেননি ।
যাইহোক সমাবর্তনে আশ্বালায়ন কৃত গৃহ্যসূত্রের আরেকটি বিশেষ মন্ত্র থেকে আমরা নারীদের উপনয়নের বিষয়ে আরো নিশ্চিত হই। " অনুলেপনেন পাণী প্রলিপ্য মুখম্ অগ্রে ব্রাহ্মণঃ অনুলিম্পেদ্। বাহু রাজন্যঃ। উদরং বৈশ্যঃ। উপস্থং স্ত্রী। ঊরূ সরণজীবিনঃ" অর্থাৎ -সমাবর্তন অনুষ্ঠানকালে অনুলেপনের জিনিস দিয়ে হাত দুটি অনুলিপ্ত করে ব্রাহ্মণ প্রথমে নিজের মুখ, ক্ষত্রিয় নিজের দুই বাহু,বৈশ্য উদর, নারী নিজ উপস্থ,পরবর্তীকালে সাংসারিক কাজে যারা অংশগ্রহণ করবে তারা তাদের উরু অনুলিপ্ত করবে ।
এইরকম আরো বিভিন্ন ধরনের মন্ত্রে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দেখা যায় যে পুরা কালে নারীদের উপনয়ন ছিল প্রচলিত একটা প্রথা। এটাও আমরা ধারণা করতে পারি যে উপনয়ন হয়তো নারীদের ইচ্ছাধীন ছিল। বৈদেশিক আক্রমণ, সাংসারিক বিভিন্ন দায়-দায়িত্ব পালন ও আরো নানাবিধ কারণের জন্য নারীদের উপনয়ন সম্ভবত আস্তে আস্তে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। "প্রায়" শব্দটা সচেতনভাবে ব্যবহার করেছি। ভারত বর্ষ পূণ্যভূমি,তপোভূমি।সাধনার পথ এখানে কারো জন্য কোনদিন রুদ্ধ হয়নি। ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই যে অন্ত্যজজাতি থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণ পর্যন্ত যারা সাধনা করতে ইচ্ছুক তারা খুব সহজেই ঈশ্বরের কাছাকাছি গেছেন। এবং পরবর্তীকালে অবতার হিসেবে এই দেশে মানুষের হৃদয়ে চিরকালীন স্থান গ্রহণ করেছেন। গার্গী অপলা মৈত্রেয়ী থেকে এর শুরু মা সারদা পর্যন্ত আমরা তাই দেখতে পাই। বর্তমান যুগেও কিন্তু আস্তে আস্তে নারীদের উপবীত ধারণের প্রবণতা বাড়ছে এবং বর্তমানেও কিন্তু আজকের ভারতবর্ষের এই পূণ্যভূমিতে নারীরা সাধনার পথে অগ্রসর হচ্ছেন। শাস্ত্রমতে যে কোনরূপ বাধা নেই বরঞ্চ সমস্ত জাতি লিঙ্গ নির্বিশেষে যে প্রত্যেককেই সাধনার পথে অগ্রসর হতে উৎসাহ দেয়া হয়েছে তার প্রমাণ আমরা ছত্রে ছত্রে পাই। এই প্রসঙ্গে নারায়ণ শিলা যে স্ত্রী,শুদ্র সবাই স্পর্শ এবং পুজো করতে পারেন তারও একটি প্রমাণ আমি উপস্থাপন করছি।
বৈষ্ণব দর্শনে আছে - " এবং স ভগবান্ সর্ব্বৈঃ শালগ্রামশিলাত্মকঃ। দ্বিজৈঃ স্ত্রীভিশ্চ শূদ্রৈশ্চ পূজ্যো ভগবতঃ পরৈঃ।। অর্থাৎ এইরূপ মহিমা সম্পন্ন সেই শালগ্রামশিলা রূপী নারায়ণকে দ্বিজাতিগণ, স্ত্রীগণ ও শূদ্রসমূহও প্রকৃত বৈষ্ণব হলে পূজা করিতে পারেন । নারীদের উপনয়ন যে পরোক্ষভাবে বিভিন্ন স্মৃতিকার স্বীকার করেছেন তার জন্য আমি আরো একটি প্রমাণ উপস্থাপনা করব। "বৈবাহিকো বিধিঃ স্ত্রীণাং সংস্কারো বৈদিকঃ স্মৃতঃ" অর্থাৎ স্ত্রীজাতির বিবাহই উপনয়ন সংস্কার।বোঝাই যাচ্ছে যে প্রাচীনকালে নারীদের উপনয়ন প্রচলিত থাকলেও পরবর্তীকালে বিভিন্ন কারণে স্মৃতি কারেরা তা অবলুপ্ত করতে বাধ্য হয়েছিলেন অথবা সামাজিক কারণে অবলুপ্ত হয়েছে কিন্তু যাতে পুরোপুরি অবলুপ্ত না হয়ে যায় তাই বিভিন্নভাবে তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলেছে অনবরত। তাঁদের যে উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ রূপে সিদ্ধ হয়েছে তার প্রমাণ বর্তমানে বিভিন্ন বালিকাদের উপনয়ন এবং পৌরোহিত্যে অংশগ্রহণ। পৌরোহিত্য বা সাধনার বিষয়টা যদি আমি আলাদাও রাখি, জীবনের পথে বাধাহীন ভাবে অগ্রসর এবং সুস্থভাবে সামাজিক সম্পর্কগুলো গড়ে তোলার জন্য প্রত্যেক বালক এবং বালিকার জাতি ধর্ম নির্বিশেষে উপনয়ন হওয়া যে একান্তই আবশ্যক তা নিয়ে কোন সন্দেহের আবশ্যকতা নেই। আগ্রহী পাঠকগণকে এই প্রবন্ধকারের "বর্তমান যুগে উপনয়নের প্রাসঙ্গিকতা" এই প্রবন্ধ পড়ে দেখার অনুরোধ রইলো।
ওঁ সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ সর্বে ভদ্রাণী পশ্যন্তু মা কশ্চিদ দুঃখ ভাগভবেৎ কৃতজ্ঞতা স্বীকার :- (ক) হিন্দু শাস্ত্রমতে উপনয়ন - অধ্যাপক মানবেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। (খ) ক্রিয়া কাণ্ডবারিধি - উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। (গ) ভবদেব পদ্ধতি -শ্রী শ্যামাচরণ কবিরত্ন বিদ্যাবারিধি
"ব্রহ্মচারী চরতি বেবিষদ্বিষঃ স দেবানাং ভবত্যেকমজ্ঞম্"(ঋগ্বেদ ১০/১০৯/৫) -- ব্রহ্মচারী ব্রহ্মচর্য পালনের ফলে দেবতাদের এক অঙ্গ হয় "উপ" অর্থাৎ গুরুর নিকট "নয়ন" মানে আনা , - বেদ অধ্যয়নের জন্য গুরু গৃহে বালককে নিয়ে আসার সময় যে সংস্কার করানো হতো তাকে উপনয়ন বলা হয়।এই সংস্কারের পর থেকেই একটি বালকের পড়াশোনা শুরু হতো। আজকের দিনের প্রেক্ষিতে ধারণা করতে পারি,আবাশিক বিদ্যালয়ে ভর্তির আগে যে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বালকদের যেতে হয় সেটারই প্রাচীন রূপ হল উপনয়ন। যদিও পরবর্তীকালে এর উদ্দেশ্য এবং ব্যবহার অনেক পরিমার্জিত এবং পরিবর্তিত হয়েছে।পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যেও আমরা এই ধরনের সংস্কার দেখতে পাই ।যেমন পার্সিদের মধ্যে "নৌজাত" বলে এই ধরনের একটি সংস্কার আছে ।
একটা কথা মনে আসতে পারে যে আজকের দিনে এই সব পেয়েছির জগতে একটি বিশেষ প্রথা অর্থাৎ জন্ম থেকে দ্বিজত্বে উত্তীর্ণ হওয়া, কি দরকার? তাই আমি সংক্ষেপে এই বিষয়টার উপর কিছু আলোকপাত করতে চাইছি। প্রথমেই বলতে চাই, এই উপনয়ন সংস্কার একটি বালকের জীবনে শৃঙ্খলা পরায়ণ হবার সুযোগ এনে দেবে। আমরা সকলেই জানি যে,জীবনে যদি শৃঙ্খলা না থাকে তাহলে কোন কিছুই সম্ভব নয়। কথা উঠতে পারে যে উপনীত না হয়েও তো জীবনে শৃঙ্খলা আনতে পারি। তা হয়তো পারি,কিন্তু উপনয়নের ফলে শাস্ত্র নির্দিষ্ট কাজ দৈনন্দিন জীবনে করার জন্য শৃঙ্খলাপরায়ণ হয়ে ওঠা অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়।
দ্বিতীয়তঃ আমি যে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করছি বা যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বড় হয়েছি আমার অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে সেই সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলকে আরও বিস্তৃত করা এবং তাকে সম্মান জানিয়ে তার নিয়ম গুলো অনুসরণ করা। আমার পূর্ব পুরুষরা এ পথে হেঁটেই জীবনে সার্বিক সফলতা লাভ করেছেন। তাহলে কেন আমি নিজের মত একা একা চলার সেই ঝুঁকি নেব যেখানে একটা নির্দিষ্ট পথে যেটা চলে অনেকেই সফল। সবাইতো রবীন্দ্রনাথ অথবা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিল গেটস হতে পারেন না ,যে প্রথাগত শিক্ষার মধ্যে প্রবেশ না করেও নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন।
তৃতীয়তঃ বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার ফলে একমাত্র যাদের উপনয়ন হয়েছে তাদেরই বিশেষ কিছু বৈদিক মন্ত্র পাঠের অধিকার দেওয়া হয় এবং সেটা পাঠ করার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি শেখানো হয়। আজকের দিনে এটা প্রমাণিত যে নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে যদি কেউ ধ্যান ইত্যাদি করেন তাহলে তার মানসিক জোর এবং কোন কাজকে দ্রুত শেষ করে ফেলার ক্ষমতা অত্যন্ত বৃদ্ধি হয়।
আমরা জানি বর্তমানে বহু বেসরকারি অভিজাত প্রতিষ্ঠান তাদের আধিকারিকদের জন্য ধ্যানের আলাদা ব্যবস্থা করছেন। তাহলে যা আমি জন্মসূত্রে সহজেই পেয়ে গেছি কেন আমি তা নিজের জীবনে প্রয়োগ করব না?
"অভিষিক্তা ভবেৎ বেশ্যা ন বেশ্যা কুলটা প্রিয়ে।
কুলটা সঙ্গমা দ্দেবী রৌরবং নরকং ব্রজেৎ"।।
ষষ্ঠ তঃ কোন একটি উপনয়ন অনুষ্ঠান মানেই সেখানে সমাজের বিভিন্ন রকম অতিথি অভ্যাগত প্রত্যেকের উপস্থিতি এবং তাদের সামনেই আমি কিভাবে জীবনটা পরিচালিত করবো তার সম্বন্ধে কিছু শপথ বাক্য পাঠ করা।সেজন্য ভবিষ্যতে কোনো কারণে যদি আমার মধ্যে কিছু বিশৃঙ্খলতা দেখা দেয় তাহলে ওই যে প্রত্যেকের উপস্থিতিতে আমি শপথ বাক্য পাঠ করেছিলাম তার একটা অনুরণন মনের মধ্যে থাকবে এবং আমাকে বাধ্য করবে সেটাকে অনুসরণ করতে আমি যাতে বিপথে পরিচালিত না হয়ে যাই ।আমার মধ্যে দায়বদ্ধতা তৈরি হবে ।অনেক সময় দেখা যায় যে অনেক মানসিক জোর সম্পন্ন ব্যক্তিও কিন্তু বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে ।সে কারণেও উপনয়নের প্রয়োজনীয়তা আছে আর শেষে একটা কথা বলতেই পারি যে আমি আমার বাবা-মা, দাদু, দিদা, ঠাকুরদা,ঠাকুরমা এনাদের প্রত্যেককে শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি ।এনারা কখনো আমাকে বিপথে চালিত করার পরামর্শ দেবেন না। সুতরাং আমার এখন এত অল্প বয়সে যেখানে সমাজের প্রায় কোন কিছু সম্বন্ধেই আমার কোন ধারণা নেই সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যাঁরা বয়োজ্যেষ্ঠ এবং অভিজ্ঞ তাদের থেকে পরামর্শ করে কাজ করাটা অনেক বেশি শুভ বুদ্ধির পরিচায়ক।
Celibate becomes an organ of God by obeying celibacy(Rg. 10/109/5) "UPA" means Guru(teacher )"NAYANA" means to bring ---The sacrament where a pupil is brought to his teacher's house to study Vedas is called "Upanayan". In ancient times a boy started his education only after this particular sacrament. Today, we can compare this ceremony to the processing for admission to a boarding school.
However, afterwards, its motto and characters have taken so many changes. In the world, we find almost the same religious sacrament in different religious groups. Like, the Parsis have followed "Noujat", which is almost the same as "Upanayan".
Now, there is a question, in today's world, where everything is available easily, why should we follow this particular sacrament where one can transfer himself from birth to second birth? That's why, in short, I want to discuss this matter. Firstly, I want to say that this holy sacrament gives chances to bring discipline to life. As we know, if there is no discipline in life, there will be nothing. Now, it can be said that without this sacrament, it is possible to bring discipline to life. Yes, it is possible, but after this Holi sacrament, by doing designated tasks instructed in the scripture in everyday life, it becomes very easy to be disciplined.
Secondly, we inherit a rich cultural heritage by birth which is my moral duty to honour that heritage as well as to extend and spread our cultural heritage. Our ancestors make their lives completely successful by following these routes. Then why should I take a risk in my life by walking alone on some new route? Everybody cannot be like Rabindranath or Bill Gates, who, without entering any traditional educational system, became an institution.
Thirdly, with detailed and vivid experiments by our ancient sages, the system of "Upanayan" has been implemented in the society where a pupil can learn special techniques for reciting the Vedic scripture as well as meditation. Today in the modern world, it is proved that if somebody follows specific rules for meditation and some yoga practice in his life, then his mental strength and physical ability increase drastically. We also know that so many elite organisations have arranged special yoga and meditation classes for their executives. Then why shouldn't I take advantage of this rich heritage which I get by birth?
Fourthly, not only in student life but in the way of life also needs mental and physical abilities with some moral values. By practising different rules after "Upanayan", automatically, specific routines become part of my life, which helps in the way of my life journey.
Fifthly, maybe for my family and social belongings, I have some materialistic advantages as well as I may have some mental power by which, without entering the process of our traditional system, I may make my life complete. But the common people do not have this advantage. So if I disobey the basic rules of society, being a son of a socially uplifted family, then the common people may follow me. That it will be harmful to them directly, which will also affect me indirectly.
Sixthly, any ritual ceremony in our society means the amalgamation of so many wise and well-wishers guests. The "Upanayan" ceremony requires some oath on how to shape my future life in some traditional way. In future, if in my life any chaotic moment comes where I may slip, then these oath-taking memories in front of society will help me back on the right way. Responsibility will come. Last but not least, we love and honour our Father, Mother, Grandfather, Grandmother, Maternal Grandfather, and Maternal Grandmother. They will never misguide us under any circumstances. So, it is wise to obey the decision of our ripe experience guardian in my life than to follow mine, without having almost no knowledge about society and life.
Whore soil / By Sumit Mukherjee
আশ্বিন কার্তিক মাসে প্রবন্ধ লিখব আর মা দুর্গা থাকবেন না,তা কি হয়? ভাবছিলাম কি নিয়ে লিখব?
সংক্ষেপিত এবং যথাযথ বিষয়ে ভাবতে গিয়ে মাথায় এলো এই বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকার কথা। দুর্গাপূজায় বহু রকম মৃত্তিকার ব্যবহার থাকলেও এই বিশেষ মৃত্তিকার কথা বোধহয় সবাই জানেন। কারণ - সহজেই অনুমেয়। কিছুদিন আগে (নাকি কয়েক বছর হবে মনে পড়ছে না) একটি বহুল প্রচারিত জামাকাপড় সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়েছে যে,একজন কুমোর ঠাকুর গড়ার জন্য বেশ্যাগৃহ থেকে মাটি এনে ঠাকুরগড়া শুরু করছেন এবং ওই ভদ্রমহিলার কন্যা সন্তান পুজোয় বেড়ানোর কথা ওই কুমোর ভদ্রলোককে বলছে এবং তিনি নিরুত্তর হয়ে ফিরে আসছেন।
এই বিজ্ঞাপনের শেষে দেখানো হলো যে, তিনি তার স্ত্রীর সাথে আলোচনা করে ওই বিশেষ প্রতিষ্ঠানের জামাকাপড় কিনে মনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে ওই বাচ্চা মেয়েটি ও তার মাকে পুজোয় সবার সাথে যোগদান করে আনন্দ করার জন্য আহ্বান জানালেন । সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং আরো বিভিন্ন বিষয়ে ওই বিশেষ বিজ্ঞাপনটির উপস্থাপনা বেশ উচ্চমানের হলেও শাস্ত্রের সাথে যে এর বিন্দু বিসর্গ সংযোগ নেই তা হলফ করে বলা যায়। শুধুমাত্র এই বিজ্ঞাপন নয়,বাংলা সিনেমা থিয়েটার নাটক ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যমেও এই বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা নিয়ে অনবরত ভুল তথ্য সম্প্রচার হয়ে চলে এবং সাধারণ মানুষের মনে এই সম্বন্ধে নানাবিধ আজগুবি ধারণা পল্লবিত হয়, যার সাথে শাস্ত্রের সঠিক নির্দেশ এবং ব্যবস্থার ন্যূনতম সংযোগও নেই।
আমি এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে শুধুমাত্র বেশ্যা শব্দের সঠিক শাস্ত্রীয় মানে এবং তার ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করব। এছাড়াও ওই বিশেষ মৃত্তিকা দুর্গাপূজায় কিভাবে ব্যবহার হয় তার সম্বন্ধেও দু চারটি কথা বলব।। আশা করা যায় এর মাধ্যমে আপনারা সহজেই বুঝতে পারবেন যে,এতদিন ধরে মনের মধ্যে থাকা বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা সম্বন্ধে আমাদের ধারণা কত ভ্রান্ত। প্রথমেই জানাই এই মৃত্তিকা কোনভাবেই প্রতিমার গায়ে প্রলেপ দেবার জন্য ব্যবহৃত হয় না বা দুর্গা প্রতিমা গড়ার কাজে কোনভাবেই এর কোন প্রয়োগ নেই। এই মৃত্তিকা মায়ের পূজায় মহাস্নানের সময় দশ রকম যে বিভিন্ন মৃত্তিকার প্রয়োজন তার মধ্যে একটি মাত্র এবং এই মৃত্তিকা শুধুমাত্র সপ্তমী অষ্টমী এবং নবমী তিথিতে যে মহাস্নান হয় সেই তিন দিন শুধু এর প্রয়োজনীয়তা।
এবার আসবো "বেশ্যা" শব্দের প্রকৃত অর্থ বিশ্লেষণে। এখানে অবশ্যই উল্লেখ্য যে আমার অশেষ সৌভাগ্য যে এই বিশ্লেষণ মহা পন্ডিত স্বর্গীয় বগলারঞ্জন বাবুর চরণতলে বসে বহুদিন আগে আমার ছাত্র অবস্থায় নেওয়া নোট মাত্র।
"বেশ্যা" শব্দের অর্থ :- গুপ্ত সাধনতন্ত্রে উল্লেখ আছে যে,কৌল,ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য গুরুজনদের মতোই সমান শক্তি সম্পন্না নারী হলেন বেশ্যা। বিভিন্ন তন্ত্রে বিবরণ আছে যে,দেবতা প্রতিষ্ঠা,দুর্গোৎসব প্রভৃতির সময় বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা নিয়ে তা দিয়ে দেবতার অভিষেক প্রভৃতি করলে দেবতার আবির্ভাব হয়। এই মৃত্তিকাকে "কুলটাদ্বার" মৃত্তিকা মনে করে অনেকে সেই মৃত্তিকা নিয়ে এসে দেবতার অভিষেক করান - যা কোনভাবেই কাম্য নয় এবং অশাস্ত্রীয়। তন্ত্রে সদাশিব বেশ্যার লক্ষণ নির্দেশ করেছেন।
"অভিষিক্তা ভবেৎ বেশ্যা ন বেশ্যা কুলটা প্রিয়ে।
কুলটা সঙ্গমা দ্দেবী রৌরবং নরকং ব্রজেৎ"।।
পূর্ণাভিষিক্তা শক্তিকেই বেশ্যা বলা হয়ে থাকে। ব্যভিচারিণী কুলটা বেশ্যা শব্দবাচ্য নয়। পূর্ণাভিষিক্তা শক্তি(স্ত্রী)যেকোনো মহাবিদ্যার আবরণ দেবতার মধ্যেই সন্নিবিষ্টা হয়েন বলেই তিনিও "বেশ্যা" এই উচ্চ উপাধি প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। এরূপ বেশ্যার লক্ষণ গুপ্ত সাধন তন্ত্র এবং নিরুত্তরমতন্ত্রে বিবৃত আছে। (মহানির্বাণ তন্ত্রম,ত্রয়োদশ উল্লাস দ্বিতীয় খন্ড) সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে,বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝি তা আদৌ নয় এবং ওই বিশেষ পবিত্র মৃত্তিকা সংগ্রহ করাও সহজ নয়। বরং এ রীতিমতো পরিশ্রমসাধ্য এবং দুর্লভ। যাই হোক,কারোর মনে আঘাত দেওয়া বা সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার মহৎ প্রতিষ্ঠায় বাধা দান করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। আমার অতি সাধারণ এবং ক্ষুদ্র বক্তব্য হল,আমরা যেন সস্তায় হাততালি কোড়ানোর লোভ সামলে সঠিক শাস্ত্র এবং গুরু নির্দেশিত পথে চলার সাহস ও শক্তি সংগ্রহ করতে পারি।
।।শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ।।
।।ওঁ তৎ সৎ।।
Tarpan / By Sumit Mukherjee
এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে মূলত তর্পণ কেন করা হয় এবং তর্পণ করলে কি ফল লাভ হয় এই ধরনের বিষয়ের উপর আলোকপাত করার প্রচেষ্টা থাকবে । যেকোনো বিষয়েরই একটা সংজ্ঞা প্রয়োজন। তর্পণ কি?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হল,তর্পণ হল পরলোকগত পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করা এবং শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে বললে বলতে হবে যে তর্পণ এক ধরনের পার্বণ শ্রাদ্ধ ।আমাদের শাস্ত্রে যে দ্বাদশ প্রকার শ্রাদ্ধের উল্লেখ আছে তার এক বিশেষ প্রকার শ্রাদ্ধ হলো এই পার্বণ শ্রাদ্ধ। পর্বে পর্বে যে শ্রাদ্ধ করা হয় তাকেই পার্বণ শ্রাদ্ধ বলা হয়। অমাবস্যা এক ধরনের পর্ব দিন। এই তর্পণ ক্রিয়া অমাবস্যায় করা হয় বলে একে পার্বণ শ্রাদ্ধ বলা হয়।
যেকোনো শ্রাদ্ধেরই কিছু বিশেষ মাহাত্ম্য আছে। প্রাচীন মুনি-ঋষিরা যাঁদেরকে স্মৃতিকার বলা হয় বিস্তৃতভাবে বিভিন্ন সংহিতা এবং স্মৃতি সম্বন্ধীয় পুস্তকে বিবরণ দিয়ে গেছেন শ্রাদ্ধের ফল সম্বন্ধে।তার মধ্যে একটি বিখ্যাত এবং বহুল প্রচলিত শ্লোক উদ্ধৃত করলেই শ্রাদ্ধের ফল সম্বন্ধে মোটামুটি ভাবে আমরা একটা ধারণা করতে পারব।
"পিতৃন্নমস্যে দিবি যে চ মূর্ত্তাঃ
স্বধাভুজঃ কাম্যফলাভিসন্ধৌ
প্রদানশক্তাঃ সকলেপ্সিতানাং
বিমুক্তিদা যেহনভিসংহিতেষু"।।
যাহারা স্বর্গে মূর্তি ধারণ করে বিরাজ করছেন এবং যারা আমার প্রদত্ত অন্ন দয়া করে গ্রহণ করেন তাঁরা সমস্ত বাঞ্ছিত ফল দিতে সমর্থ এবং কোন ফলের কামনা না করে ভক্তি সহকারে তাদের শ্রাদ্ধ করলে তারা মুক্তি প্রদান করেন, সেই পরম পূজনীয় পিতৃগণ কে প্রণাম করি।
এই লেখার সংক্ষিপ্ত পরিসরে আরো দুটো সংশয় সাধারণ ভাবে নিরসন করার চেষ্টা করব। এক, তর্পণ না করলে কি হয় এবং এই তর্পনের মাধ্যমে যে শ্রদ্ধাঞ্জলি আমরা অর্পণ করছি তা আমাদের পিতৃ পুরুষের কাছে যাচ্ছে কিভাবে? এর উত্তরে বলা যেতে পারে, শাস্ত্র বাক্য অনুসারে যেকোন শ্রাদ্ধবাসরেই পিতৃপুরুষগণ শ্রাদ্ধান্ন বা উত্তরপুরুষের দেওয়া দ্রব্য গ্রহণ করতে এসে উপস্থিত হন। যদি ওই সময়ে উত্তরপুরুষ গণ শ্রাদ্ধান্ন অর্পণ করেন তাহলে পিতৃপুরুষগণ সন্তুষ্টচিত্তে ওই অন্ন গ্রহণ করে সন্তানদের আশীর্বাদ করে বিদায় নেন। কিন্তু যদি তারা দেখেন যে সেই সময় কোন শ্রাদ্ধের আয়োজন নেই তাহলে তারা মনে দুঃখ নিয়ে ফিরে যান যা তার সন্তানদের জন্য কখনোই শুভ হতে পারে না।
আর দ্বিতীয় প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে সন্তানদের অর্পণ করা শ্রাদ্ধান্ন বা অন্যান্য দ্রব্যের সারবস্তু মন্ত্রপ্রভাবে বর্তমানে তার পিতৃ-পুরুষের যে জন্ম (যেমন বৃক্ষ হলে বায়ু তৃণভোজী হলে শাকপাতা ইত্যাদি) সেই জন্মের খাদ্যের সারবস্তু তে রূপান্তরিত হয়ে পিতৃপুরুষের তৃপ্তি সাধন করে।পরিশেষে বলতে পারি,এই যে তর্পনের ব্যবস্থা তার মন্ত্র গুলোর মর্মার্থ অনুধাবন করলে সহজেই বোঝা যায় যে আমাদের প্রাচীন স্মৃতি কারেরা কতটাই বিচক্ষণ এবং দূরদর্শী সম্পন্ন ছিলেন যে এই তর্পণ ক্রিয়ার মাধ্যমে তারা শুধুমাত্র যে নিজের পরিবারের তৃপ্তি সাধন তা নয় বরঞ্চ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে ব্রহ্মান্ডের সমস্ত প্রাণী গণ এবং যাদের কেউ ছিল না এমনকি সঠিকভাবে অগ্নি সংস্কার পর্যন্ত হয়নি তাদের ও তৃপ্তি সাধনের ব্যবস্থা করে গেছেন। তাই অবশ্যই এই অভিমত পোষণ করা যায় যে প্রত্যেক সন্তানের উচিত যে সম্ভব হলে প্রতিদিন বা অসুবিধা হলে পিতৃপক্ষের সবকটি দিন এবং তাও না পারলে অন্তত মহালয়ার দিন সঠিক শাস্ত্র নির্দেশিত পথে তর্পণ করুন এবং নিজের ও সমাজের মঙ্গল সাধনই ব্রতী হন। ওম তৎ সৎ।
Vishwakarma / By Sumit Mukherjee
সামনেই ভাদ্র মাস। ভাদ্র মাস আসলেই লক্ষ্মী পূজার সাথে সাথে যে পুজোর কথা আমাদের মনে আসে তা হল এই মাসের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকর্মা পুজো। আজ পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে শিল্পের যা দুরবস্থা তাতে বিশ্বকর্মার ধ্যান এবং তার আশীর্বাদ লাভ করা একান্তই প্রয়োজন। তাই আমি এ মাসে ভগবান বিশ্বকর্মা কে নিয়ে দু এক লাইন লেখার কথা ভাবলাম।
লেখাটা শুরু করি বিশ্বকর্মার ধ্যান মন্ত্র এবং তার বিশ্লেষণ নিয়ে। তারপর এই পুজোর প্রাচীনতা এবং বাহন নিয়ে দু একটা কথা বলব।
প্রথমে ধ্যান মন্ত্র :-
"দংশপাল মহাবীর সুচিত্র কর্ম্মকারক।
বিশ্বকৃৎ বিশ্বধৃচ্চ ত্বং রসনা মানদন্ডধৃক্"।।
অর্থাৎ :- হে বিশ্বকর্মা, তুমি সাঁড়াশি দিয়ে সকলকে রক্ষা করছ, তুমি মহাবীর,তুমি অতি সুন্দর শিল্প কার্য্য কর, তুমি জগতের নির্মাণ ও পোষণ করছ,তুমি মাপদড়ি ও মানদন্ড ধারণ করে আছো।
ধ্যানমন্ত্রেই পরিষ্কার, এই যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অপূর্ব সৃষ্টি বিশ্বকর্মার আশীর্বাদ না থাকলে তা সম্ভবপর হতো না। মহাভারত, পুরাণ ইত্যাদি গ্রন্থের মধ্যে যে সমস্ত সুরম্য অট্টালিকা নগর যেমন - অলকা পুরী,স্বর্ণলঙ্কা,দ্বারকা ইত্যাদির বর্ণনা দেওয়া আছে তা সমস্তই বাবা বিশ্বকর্মার আশীর্বাদ পুষ্ট। শুধুমাত্র স্থাপত্য নয়, ইন্দ্রের বজ্র,দেবী চণ্ডীর হাতের পরশু,দেবাদিদেব মহেশ্বরের ধনুক ইত্যাদি যুদ্ধাস্ত্রের বিষয়েও তাঁর সৃষ্টি অমর। এছাড়া ভাবতে অবাক লাগে,যে বিমানের সাহায্যে আমরা এত দ্রুত আজকে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করেছি তারও কি সংকেত বা রূপ কল্পনা এনার ছিল? অবশ্যই ছিল। কারণ কুবেরের যে পুষ্পক বিমান তা তো বিশ্বকর্মারই সৃষ্টি। সংক্ষেপে বলা যেতে পারে,আমাদের সনাতন সমাজে যে কোন ধরনের কারিগরী বিদ্যা প্রয়োগ বিশ্বকর্মার আশীর্বাদ ছাড়া অসম্ভব। এ প্রসঙ্গে একটা প্রচলিত পৌরাণিক গল্প বলার লোভ সামলাতে পারছি না। পুরান অনুসারে শাপগ্রস্থ হয়ে বিশ্বকর্মা এবং অপ্সরা ঘৃতাচী মর্তে অবতীর্ণ হয়ে বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং নয় পুত্রের জন্ম দেন। এই নয় পুত্রকে স্বয়ং বিশ্বকর্মা নিজে হাতে তালিম দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে এনারাই ধরাধামে বিভিন্ন শিল্পবিদ্যা এবং ওই সংক্রান্ত জাতির সৃষ্টি করেন।
বিশ্বকর্মার উল্লেখ বা ওনার পুজোর বিবরণ পৌরাণিক কাল ছাড়িয়ে ঋগ্বেদের আমল পর্যন্ত বিস্তৃত। আমরা ঋগ্বেদে দশম মন্ডলে দুটো বিশেষ সূক্তে(৮১, ৮২) ওনার পরিচয় পাই। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে সৃষ্টির আদি থেকেই ওনার আশীর্বাদে এই সুন্দর বিশ্ব আমরা পেয়েছি। বিশ্বকর্মার বাহন সম্বন্ধে একটু আলোচনা করে এই প্রবন্ধ শেষ করব। আমরা সবাই জানি যে বিশ্বকর্মার বাহন হাতি। হাতির প্রভুত শক্তি যার মাধ্যমে ভারী জিনিস ওঠা নামা করা বা শুঁড় যেটা হাতি যেরকম ইচ্ছে চালনা করতে পারে একজন সুদক্ষ শিল্পীর হাতের মত ইত্যাদি কারণে হাতি বিশ্বকর্মার বাহন হিসেবে একদম উপযুক্ত। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে পুরানান্তরে বিশ্বকর্মার আরো একটি বাহন আছে যা হল হাঁস। এই হাঁস হলো শুদ্ধ জ্ঞানের প্রতীক। সুতরাং বর্তমান যুগে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা কম্পিউটার অটোমেশনের জগতও যে ওনার আশীর্বাদ ছাড়া চলতে পারবে না, তা আমরা বুঝতে পারি।
যাইহোক এত সংক্ষিপ্ত পরিসরে বিশ্বকর্মার মতো সর্বব্যাপী,সর্বশক্তিশালী,মহাবীর শিল্পীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করা আমার মত অতি সাধারণের কষ্ট কল্পনা মাত্র। শুধুমাত্র কায় মনো বাক্যে ওনার কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করি,উনি যেন ওনার কৃপা দৃষ্টি এই বঙ্গের উপর বর্ষণ করেন এবং আমরা যেন পুনরায় ওনার আশীর্বাদ ধন্য হয়ে শিল্পে আমাদের হৃত গৌরব ফিরে পাই। "ওম বিশ্বকর্ম্মণে নমঃ" তথ্যসূত্র :- (ক) আহ্ণিক কৃত্ত্যম্। শ্রী শ্যামাচরণ কবিরত্ন বিদ্যাবারিধি (খ) দেবদেবী ও তাঁদের বাহন। স্বামী নির্ম্মলানন্দ
Mall Mas / By Sumit Mukherjee
"অমাবস্যা দ্বয়ং যত্র রবিসংক্রান্তি বর্জিতম।
মলমাসঃ স বিঞ্গেয় বিষ্ণু স্বপিতি কর্কটে"।।
----যে মুখ্য চান্দ্র মাসে দুইটি অমাবস্যা রবি সংক্রান্তি বর্জিত হবে,সেই মুখ্য চান্দ্র মাসকে মল মাস বলা হয়। --"স্মৃতিচিন্তামণি - শ্রীহরিদাস সিদ্ধান্ত বাগীশ"।
মলমাসের সংজ্ঞা হলো ওপরে লেখা শ্লোকটি। এই বছর অর্থাৎ বাংলা ১৪৩০ সালে শ্রাবণ মাস হল মল মাস। আমি এই লেখায় এ বছর শ্রাবণ কিভাবে মল মাস হলো তার ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করব। উপরোক্ত সংজ্ঞায় বোঝাই যাচ্ছে যে, যেকোনো মুখ্য চান্দ্র মাসের দুটি অমাবস্যা রবি সংক্রান্তিহীন হতে হবে। আমরা জানি যে,অমাবস্যার পরবর্তী তিথি থেকে অর্থাৎ শুক্লা প্রতিপদ থেকে পরবর্তী অমাবস্যা পর্যন্ত যে মাস তাকে বলে মুখ্য চান্দ্র মাস। এ বছর ৩১ শে আষাঢ় রবি সংক্রান্তি হবে বিকেল পাঁচটা সাতাশের পরে। অর্থাৎ সূর্যদেব মিথুন রাশি থেকে কর্কটে যাবেন বিকেল পাঁচটা সাতাশের পর। ওইদিনই অমাবস্যা ছাড়ছে রাত দশটা ৫৫ এ। বোঝা গেল যে রাত দশটা পঞ্চান্নর পর মুখ্য চান্দ্র মাস শুরু হচ্ছে। কিন্তু রবি সংক্রান্তি হচ্ছে তার প্রায় সাড়ে ৫ ঘন্টা আগে। সুতরাং রবি সংক্রান্তি মুখ্য চান্দ্র পাচ্ছে না।।
পরবর্তী অমাবস্যা ৩০ শে শ্রাবণ ছাড়ছে দুপুর ২ টা ১৪ এ। কিন্তু রবি সংক্রান্তি হবে 31 শে শ্রাবণ শেষ রাত্রি ৪ টে ৪৯ এ। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে,যেহেতু আগের দিনই মুখ্য চন্দ্রমাস শুরু হয়ে গেছে অর্থাৎ আগের মুখ্য চান্দ্র মাসটি শেষ হয়ে যাচ্ছে রবি সংক্রান্তির প্রায় দেড় দিন আগে। খুব সহজেই বোঝা গেল যে,৩১ শে আষাঢ় রাত দশটা ৫৫ থেকে ৩০ শে শ্রাবণ দুপুর ২:১৪ পর্যন্ত যে মুখ্য চান্দ্র মাস থাকবে তাতে কোন রবি সংক্রান্তির স্পর্শ করবে না। তাই ওই মুখ্য চান্দ্র মাসটি মলমাস হবে।যে কারণে এবছর শ্রাবণ মাসকে মলমাস বলা হচ্ছে।
মলমাসের কর্তব্য ও অকর্তব্য :- সাবকাশ সংস্কার কর্ম যেমন বিবাহ ইত্যাদি এই মাসে নিষিদ্ধ। নিরব কাশ কর্ম যেমন অন্নপ্রাশন প্রভৃতি মলমাসে করা যায়। চান্দ্র শ্রাবণে যে সমস্ত ধর্মকৃত্য বিহিত,যেমন ঝুলন ইত্যাদি সৌর ভাদ্র মাসে শুদ্ধ চান্দ্রশ্রাবণে হবে।
--------- শ্রী সুমিত মুখার্জ্জী